কাজী নজরুল ইসলামের বহুল জনপ্রিয় ‘শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল’ গানটি দিয়েই শুরু করি। এটি কেবল বিদ্রোহের আহ্বান নয়, ক্ষমতার বিরুদ্ধে শাসককে তার ভাষা ফিরিয়ে দেওয়ারও এক রাজনৈতিক কৌশল। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যে শব্দ দিয়ে ক্ষমতাসীনরা কাউকে অপমান করতে চেয়েছে, সেই শব্দই প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। হয়েছে বুমেরাং। আজকের দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি প্রজন্ম তারই প্রতিধ্বনি করছে। তারা অপমান মুছে ফেলতে চায় না; বরং সেটিকেই নতুন অর্থে দখল করে নেয়। একসময় রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্য লাগত দলীয় কার্যালয়, গঠনতন্ত্র, কমিটি আর সম্মেলন। এখন লাগে ইন্টারনেট, একটি স্মার্টফোন, একটি মিম আর শাসকের একটি বেফাঁস মন্তব্য, বাকিটা করে দেয় অ্যালগরিদম। তাই ডিজিটাল যুগে রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল কখন যে একটি ফেসবুক পেজ হয়ে দাঁড়ায়, তা বোঝার আগেই সেই পেজের ফলোয়ার সংখ্যা নিজ দলের কর্মীর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। এ যুগে ভাষা শুধু যোগাযোগ মাধ্যম নয়; সেটিই কখনো সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগঠক। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলনের মধ্যে এই মিল লক্ষণীয়। চার দেশেই তরুণরা প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে নিজেদের প্রতীক, শব্দ ও পরিচয় নির্মাণ করছে। আমাদের যাদের বয়স চল্লিশোর্ধ্ব, তারা নীরব সাক্ষী হয়ে রইলাম পার্টি অফিস, দেয়াল লিখন, পোস্টার, লিফলেট, পাঠচক্র কিংবা দীর্ঘ বক্তৃতার দিন শেষ বলে। আর সেই জায়গা ক্রমেই দখল করছে ডিজিটাল মিম, ব্যঙ্গ, হ্যাশট্যাগ এবং ভাইরাল প্রতীক। ফলে রাজনীতির ভাষাও বদলাচ্ছে, রাজনৈতিক যোগাযোগের পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এক ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেল, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে ক্ষোভের মধ্যে একজন মন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। তারা শুধু প্রতিবাদ করেনি; মন্তব্যটিকেই নিজেদের পরিচয়ে পরিণত করেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেয় ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’। যে শব্দ দিয়ে তাদের হেয় করা হয়েছিল, সেটিই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ব্যানার।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সময়ও দেখা গিয়েছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একটি সংবাদ সম্মেলনে বিতর্কিত রাজনৈতিক মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে জনমত, ব্যঙ্গ, ডিজিটাল প্রচারণা এবং শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর রাজনৈতিক পালাবদলের অংশ হয়ে উঠেছিল, যার ফল হয়েছিল ভয়াবহ। ডিজিটাল যুগে তাই কোনো বক্তব্য আর কেবল বক্তব্য থাকে না; সেটি খুব দ্রুত রাজনৈতিক যোগাযোগের উপাদানে রূপ নেয়।
ভারতে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। কয়েকজন বেকার তরুণকে ‘ককরোচ’ বলে আদালতে করা একটি মন্তব্যের পর অপমানিত তরুণদের একাংশ সেই পরিচয়ই নিজেদের নামে গ্রহণ করে। শুরুটা ছিল ব্যঙ্গ। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ব্যঙ্গ সংগঠিত রাজনৈতিক যোগাযোগে রূপ নেয়। মিম, অ্যানিমেশন, গ্রাফিকস ও ছোট ভিডিওর মাধ্যমে তারা বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা সংকট ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে জনমত গড়ে তোলে। পরে সেই অনলাইন উদ্যোগ রাজপথেও উপস্থিত হয়। একটি অবমাননাকর শব্দ কীভাবে রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নিতে পারে, তার বিরল উদাহরণ এটি। দেখা যাচ্ছে একটি খেয়ালি মন্তব্য কেবল নিষ্পাপ ব্যঙ্গ থাকছে না; তা রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি সচেতন কৌশল হয়ে উঠছে। যোগাযোগ তত্ত্বে একে ফ্রেমিংয়ের পাল্টা ব্যবহার বলা যায়। সাধারণত ক্ষমতাসীনরা একটি বিশেষ শব্দ বা পরিচয়ের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে জনমত গঠনের চেষ্টা করে। কিন্তু এখানে ঘটছে উল্টোটি। আন্দোলনকারীরাই সেই পরিচয়কে নতুন অর্থ দিচ্ছে। ‘আরশোলা’ কিংবা ‘ব্রয়লার মুরগি’ আর অপমানের প্রতীক থাকছে না; হয়ে উঠছে প্রতিরোধের ভাষা। অর্থাৎ অর্থ তৈরির ক্ষমতাটিই হাতবদল হচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি মিম, একটি প্রতীক বা একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম মুহূর্তেই হাজারো মানুষের যৌথ সৃজনে নতুন রাজনৈতিক অর্থ পেয়ে যায়। রাজনৈতিক বার্তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত, অনুভূতিনির্ভর এবং অংশগ্রহণমূলক। নেপালের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে ‘নেপো কিড’ শব্দটি কেবল একটি সেøাগান ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার উত্তরাধিকারভিত্তিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের ভাষা। রাজনৈতিক পরিবারের সুবিধাপ্রাপ্ত সন্তানদের বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দটি তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়। ফলে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু সরকার নয়, বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও উঠে আসে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে রাখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। জেন-জি কেবল সরকারের সমালোচনা করছে না; তারা প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষাকেও চ্যালেঞ্জ করছে। তারা মনে করছে, পুরনো রাজনৈতিক অভিধান তাদের অভিজ্ঞতা ধারণ করতে পারছে না। তাই তারা নিজেদের অভিধান নিজেরাই লিখছে। এই প্রবণতা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। বাংলাদেশে ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তাদের স্বতন্ত্র চিন্তা ও আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কিন্তু তখন যে শব্দটি ছিল অবমূল্যায়নের হাতিয়ার, আজ সেটিই প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ফিরে এসেছে। এখানেই পরিবর্তনটি তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতা একই ভাষা ব্যবহার করছে, কিন্তু সমাজ সেই ভাষা আগের মতো গ্রহণ করছে না।
এশিয়ার দিক থেকে চোখ ফেরাই পৃথিবীর বুকে। দুনিয়ার রাজনীতিতে এমন ঘটনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। বরং রাজনৈতিক যোগাযোগে এর একটি স্বীকৃত ধারণা আছে রি-অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন বা অপমানসূচক পরিচয় পুনর্দখল। অর্থাৎ ক্ষমতাবান যে শব্দ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করতে চায়, আক্রান্তরাই সেই শব্দকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করে। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের একাংশকে ‘বাস্কেট অব ডিপ্লোরেবলস’ (অর্থাৎ ‘নিন্দনীয়’ বা ‘অযোগ্য’ লোকদের একটি দল) বলে অভিহিত করেছিলেন। ট্রাম্প-সমর্থকরা উল্টো এই পরিচয়ই গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। টি-শার্ট, টুপি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল থেকে শুরু করে নির্বাচনী সমাবেশ সবখানেই ‘প্রাউড ডিপ্লোরেবলস’ পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে তুরস্কের গেজি পার্ক আন্দোলনে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান আন্দোলনকারীদের ‘লুটেরা’ বললে, আন্দোলনকারীরা সেই পরিচয়ই নিজেদের ব্যাজে, পোস্টারে, গানে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারণ করেন। সাম্প্রতিক গবেষণাও দেখিয়েছে, এ ধরনের পুনর্দখল বা ৎবধঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃরড়হ শুধু অপমানের অভিঘাত কমায় না; বরং একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, সংহতি এবং সমষ্টিগত আন্দোলন গড়ে তুলতেও সহায়তা করে। জায়নেপ তুফেকচি তার টুইটার অ্যান্ড টিয়ার গ্যাস গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনকে শুধু দ্রুত সংগঠিতই করে না, বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মধ্যে একটি যৌথ রাজনৈতিক পরিচয়ও তৈরি করে। ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ বা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র মতো উদ্যোগগুলো সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষকে একই রাজনৈতিক ভাষায় যুক্ত করতে পারে, যা পরে অনলাইন থেকে রাজপথেও ছড়িয়ে পড়ে।
জেন-জি হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দিচ্ছে, তা হলো ক্ষমতার দেওয়া পরিচয় তারা আর নিঃশব্দে মেনে নেয় না। তারা সেই পরিচয়কে ছিনিয়ে নেয়, নতুন অর্থ দেয়, নতুন প্রতীক বানায়। অপমানের ভাষাকেই প্রতিরোধের ভাষায় পরিণত করে। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক যোগাযোগের এক নতুন ব্যাকরণ। যার অভিধান লেখা হচ্ছে, ফেসবুক টাইমলাইন, ইনস্টাগ্রামের রিল, টিকটক ভিডিওতে এবং শেষ পর্যন্ত তা গড়ায় রাজপথে। ইতিহাস বলে, প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে। একসময় সেই ভাষা ছিল দেয়াল লিখন, পোস্টার, লাল পতাকা কিংবা মুষ্টিবদ্ধ হাত। আজ সেই জায়গা দখল করেছে মিম, হ্যাশট্যাগ, ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক আর ডিজিটাল কমিউনিটি। তাই ‘রাজাকার’, ‘ব্রয়লার মুরগি’ কিংবা ‘আরশোলা’কে নিছক মুখ ফসকে বলা কোনো শব্দ বা ভাইরাল রসিকতা ভেবে ভুল করলে ভুল হবে। এগুলো হয়তো এমন এক নতুন রাজনৈতিক অভিধানের প্রথম শব্দ, যেখানে অপমান আর আত্মসমর্পণের ভাষা নয়; বরং আত্মপরিচয়, প্রতিরোধ এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ানের ভাষা। শেষ পর্যন্ত রাজনীতির লড়াই শুধু রাজপথে নয়, ভাষার ভেতরেও। যে ভাষার নিয়ন্ত্রণ হারায়, সে ধীরে ধীরে জনমতের নিয়ন্ত্রণও হারায়। তাই প্রশ্ন এখন আর তরুণরা কী বলছে, তা নয়; প্রশ্ন হলো প্রচলিত ‘বুড়ো’দের রাজনীতি কি এখনো বুঝতে পেরেছে যে অ্যালগরিদমের যুগে একটি ‘কিশোর’ মিম কখন যে একটি আন্দোলনের জন্ম দেয়, আর একটি অপমান কখন যে একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হয়? মহাভারতের বুড়ো ভীষ্ম বনাম কিশোর অভিমন্যুর লড়াই যেন আমরা না ভুলি। কিশোরদের ডিজিটাল অ্যালগরিদম-চক্রব্যূহের ফাঁদে পা দিয়ে বয়স্ক রাজনীতিবিদরা পচা শামুকে পা কাটছেন না তো?
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়