চাকরিতে নারী কোণঠাসা

সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্যের অবসানের দাবিতে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। জুলাই অভ্যুত্থানের জেরে ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এর পর পাঁচটি কোটার মধ্যে দুটি পুরোপুরি বাতিল এবং দুটি আগের চেয়ে অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে সরকারি চাকরিতে যেখানে ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল, সেটা এখন কমে নেমেছে ৭ শতাংশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাকরিতে কোটার যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন ছিল। তবে নারী কোটা পুরোপুরি বাতিল কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কোটা ১ শতাংশে নামিয়ে আনা সামগ্রিকভাবে দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয়নি।

৫ আগস্টের আগে সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা থাকার পরও পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে ছিলেন। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাম্প্রতিক সুপারিশেও প্রথম (ক্যাডার) ও দ্বিতীয় শ্রেণির (গেজেটেড) কর্মকর্তা পদে নিয়োগে নারীর সংখ্যা কম। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অথবা পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর প্রার্থীরাও এসব চাকরিতে অনেক পিছিয়ে আছেন। পিএসসির একাধিক বার্ষিক প্রতিবেদন ও সবশেষ ৪৭তম বিসিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন বাস্তবতা পাওয়া গেছে।

পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমও স্বীকার করছেন, সরকারি চাকরিতে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমছে। তবে তিনি মনে করেন, বিষয়টি কোটা বিলোপের কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটছে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে একটা টাইম সিরিজের (পরপর পাঁচ থেকে সাতটি বিসিএস পরীক্ষা) ডেটা নিয়ে গবেষণা করতে হবে। পিএসসি সূত্র জানায়, সবশেষ ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২২ নারী প্রার্থী আবেদন করলেও প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উপস্থিত হন ৯০ হাজার ২৬২ জন। তাদের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত কৃতকার্য হন মাত্র ২৯৪ জন। একই বিসিএসে ১ হাজার ৪০ জন পুরুষ প্রার্থী কৃতকার্য হয়েছেন। এই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে গত জুনের শেষদিকে মোট ১ হাজার ৩৩৪ জনকে নিয়োগ দিতে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চূড়ান্ত সুপারিশ করে পিএসসি। তথ্য অনুযায়ী এই বিসিএসে নারীদের নিয়োগের হার ২২ শতাংশ। পিএসসির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩৪তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ নারীদের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ৪১তম বিসিএসে ২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, ৪৩তম বিসিএসে ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ৪৪তম বিসিএসে ২০ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী প্রার্থী চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ, অতীতে কোটা সুবিধা পেয়েও বিসিএসে নারীদের কৃতকার্য হওয়ার হার ক্রমাগত কমছে। এমন পরিস্থিতিতে কোটা পুরোপুরি বাতিলের ফলে সামনে নারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষায় নারী প্রার্থীদের সাফল্য অ্যালার্মিংলি (উদ্বেগজনকভাবে) কমছে। এটা কী কারণে ঘটছে, তা এখনই বলা যাবে না। পিএসসির পরীক্ষাগুলোয় স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। এখানে কাউকে বঞ্চিত করা বা কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি এমন একটা ব্যবস্থা করেছি, যাতে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে কে থাকবেন, তা অন্য কেউ জানেন না। সকালে বোর্ডে এসে তাদের দেখা হয়। লিখিত পরীক্ষার খাতা মুল্যায়নেও সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। আমি এটুকু বলতে পারি, অন্তত আমার সময়ে কোনো বৈষম্য হবে না।’

পিএসসির সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি দৃশ্যমান যে সরকারি প্রশাসনে মেয়েদের অংশগ্রহণ ডিক্লাইনিং (ক্রমাবনতি) অর্ডারে আছে। জনপ্রশাসন বলছে, নারীদের সংখ্যা প্রশাসনে মাত্র ২৯ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিসিএস (বিশেষ করে ৪৫ ও ৪৬তম) পরীক্ষাগুলোতেও মেয়েদের কম উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তারা লিখিত পরীক্ষায় ঝরছেন, মৌখিকে আরও ঝরে পড়ছেন।’   

ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান বলেন, ‘কোটা ব্যবস্থা নারীরাই চাননি। অন্তত ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের চেতনা তাই ছিল। কিন্তু এতে নারীরা কি লাভবান হয়েছেন? না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোটা দিতে হবে এমনটা বলছি না। তবে অন্য কী করা যায়; কী কী করলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে, তা এখন সিরিয়াসলি ভাবতে হবে।’

কোটা সংস্কার চেয়ে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই দেশের সর্বোচ্চ আদালত এক রায়ে তখনকার বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনে। বাদ দেওয়া হয় নারী (১০ শতাংশ) ও জেলা কোটা (১০ শতাংশ)। রায়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান/নাতি-নাতনিদের ৩০ শতাংশ কোটা কমিয়ে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের ১ শতাংশ কোটা অপরিবর্তিত রাখা হয়। বাদ দেওয়া হয় ১০ শতাংশ জেলা কোটাও। ওই রায়ের পর থেকে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগই হচ্ছে মেধার ভিত্তিতে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রাহেদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারি নিয়োগে এখন ৭ শতাংশ কোটাই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরীক্ষায় ভালো করাই চূড়ান্ত মেধার পরিচয় নয়। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অথবা চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা জনগোষ্ঠী নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক সময় সুবিধাপ্রাপ্তদের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতা করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় সহায়তা করা। এ লক্ষ্য থেকেই বিভিন্ন দেশে সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন রূপে কোটা ব্যবস্থা দেখা যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষেত্রবিশেষে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নারী কোটা রয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি চাকরিতে আছে ১০ শতাংশ নারী কোটা। ইউরোপ ও আমেরিকায় রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়ে নারী-পুরুষ ভারসাম্য রক্ষা করার কথা বলা আছে।

পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় হাজার হাজার ছেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভালো রেজাল্ট করে মেয়েরা ভর্তি হতে পারছেন। কোনো কোনো বিভাগে ছেলের চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, যখন একটি সর্বোচ্চ ক্যাডারের চাকরির পরীক্ষা আসছে, তখন কোনো না কোনো পর্যায়ে মেয়েরা ঝরে যাচ্ছেন। এটি ভাবনার বিষয়; গবেষণার বিষয়। আমাদের এ বিষয়ে খুব একটা কাজ করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে ড. ফেরদৌস আরফিনা বলেন, ‘নারীর অন্য অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তার পরিবার, বিয়ে, শ্বশুরবাড়ি, সমাজব্যবস্থা সবই প্রতিনিয়ত তাকে পীড়া দেয়। এগুলো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বা বাধা। উপরন্তু রাষ্ট্র তার সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব নেয় না।’

নারী কোটা বাতিল এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা ১ শতাংশে নামিয়ে আনায় দেশের জন্য গভীর সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন অধিকারকর্মীরা। উন্নয়নকর্মী ও রাজনীতিবিদ আন্না মিনজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একবার ভাবুন তো কোটা থাকে কখন? এর জবাব হলো যতক্ষণ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী মূলধারার সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন না করে, ততক্ষণ। এখন কথা হলো, আমাদের নারীরা কি আশানুরূপ জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছেন? কিংবা আমরা যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আছি, তাদের অবস্থান কোথায়?’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির এই এমপি আরও বলেন, ‘একটি আন্দোলনের কারণে কোটা ব্যবস্থার অবসান বা প্রত্যাহার হয়ে গেছে এটা যেমন সত্য; তেমনি এটাও অনস্বীকার্য যে, নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য আরও কিছুদিন এই কোটা থাকলে ভালো হতো।’

তিনি বলেন, ‘মেয়েরা হয়তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় ভালো করেন। কিন্তু চাকরিতে তারা এখনও ভালো করতে পারছেন না। তাই একটু বাড়তি কেয়ার দরকার আছে।’