গুলশানের বাসায় সাহাবুদ্দিন

আড়াই বছরের বঙ্গভবন অধ্যায় সমাপ্ত

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ এএম

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ ছেড়ে ব্যক্তিগত জীবনে ফিরলেন মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগের পর গতকাল রবিবার দুপুরে তিনি সপরিবারে বঙ্গভবন ছেড়ে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে উঠেছেন। এর মধ্য দিয়ে আড়াই বছরেরও বেশি সময় রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক শেষ হয়।

বঙ্গভবনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, দুপুরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে তিনি সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেন। বিদায়ের আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন। এরপর গাড়িবহর নিয়ে গুলশানের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

সূত্রগুলো জানায়, গত কয়েকদিন ধরেই তার গুলশানের বাসভবন প্রস্তুত করা হচ্ছিল। বসবাসের উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সরকারি টেলিফোন সংযোগ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যক্তিগত মালামাল, নথিপত্র ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও ধাপে ধাপে সেখানে স্থানান্তর করা হয়, যাতে দায়িত্ব ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নতুন বাসভবনে উঠতে পারেন।

বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাবেক রাষ্ট্রপতির বিদায়ে ছিল না বড় কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনা। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে ও তাদের বিদায় জানিয়ে তিনি বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। তিনি গুলশানের বাসভবনে ওঠার পর আপাতত বিশ্রামে থাকবেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর এখন স্বাস্থ্যগত বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। গুলশানের বাসভবনে কিছুদিন অবস্থানের পর চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশে যাবেন। সম্ভাব্য সফরের সময়সূচি ও গন্তব্য নিয়ে প্রস্তুতি চললেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে তিনি ব্যক্তিগত জীবনেই মনোযোগ দেবেন। 

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত তার পদত্যাগের মাধ্যমে সে অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

লন্ডনে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন এমন তথ্য নেই : গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি পত্রপত্রিকায় এসেছে, তবে সরকারের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। ইন্টারনেটের যুগে কথা বলতে লন্ডনে যেতে হয় না, এখান থেকেই বলা যায়।’ 

বিরোধী দল মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছে এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তারা রাষ্ট্রপতির গ্রেপ্তার চায়। তবে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার তাদের আছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে বলেও জানান মন্ত্রী; প্রতিবাদ করার স্বাধীনতাও থাকবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় স্বৈরাচারী সরকারের শেষদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি বিধিবিধান ও সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড; তার (ইনডেমনিটি) দায়মুক্তি আছে। ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য বিষয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। এর বাইরে যদি কেউ বক্তব্য দিয়ে থাকে সে স্বাধীনতা তাদের আছে। কিন্তু সেসবে আমলে নেওয়ার মতো কিছু দেখি না।’

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সে সময় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা সেই সময়কার বিষয়। সেটা আইন অনুসারেই চলবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন অনুসারে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা তা তিনি পাবেন। সুরক্ষার জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট’স গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) ও অন্যান্য সুবিধা ছয় মাসের জন্য পাবেন। পুলিশি সুবিধাসহ অন্য নিরাপত্তা-সুবিধাও পাবেন।

আইনসংহতভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার : সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি আইনসংগতভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট  মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে নবীন আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তাকে গ্রেপ্তারের জন্য এনসিপির দাবির বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘দাবি তারা করতেই পারেন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সেটাকে আইনসংগতভাবে দেখব। তাদের দাবি আইনসংগতভাবে কতটুকু যৌক্তিক, আইনসংগতভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটা আমরা দেখব।’

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১২৩-এর ২ অনুচ্ছেদ অনুসারে যেদিন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন তার ৯০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। এটা সাংবিধানিকভাবেই সেটেল্ড ইস্যু।

সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আলাদা অনুসন্ধান নয় বাংলাদেশ ব্যাংক : রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলাদা কোনো অনুসন্ধান চালাবে না। তার বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো তদন্ত না হলেও পুরনো কোনো ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ কথা বলেছেন। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মো. সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই তাকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগতভাবে আলাদা কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনার পরিকল্পনা নেই।

আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদন্ত চলছে। এসব তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : তফসিল ঘোষণার জন্য স্পিকারের কাছে সময় চাইবে ইসি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে সময় চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। গতকাল রবিবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি। মেয়াদ পূরণের আগেই গত শুক্রবার রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন মো. সাহাবুদ্দিন। এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়, যার জন্য সংসদ সচিবালয় থেকে ভোটার তালিকা তথা সংসদ সদস্যদের নাম ইসি সচিবালয়ে পাঠানো হবে। এর ভিত্তিতে ইসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা করবে। এরপর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সিইসি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বিষয়ে গতকাল সিইসির কার্যালয়ে সব নির্বাচন কমিশনার ও সিনিয়র সচিবদের সমন্বয়ে অনির্ধারিত বৈঠক হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনের পর্যালোচনা হয়েছে। এরপর তফসিল ঘোষণার পরবর্তী কার্যক্রম ঠিক করতে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখা সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার সাক্ষাতের জন্য স্পিকারের দপ্তরে চিঠি দিতে পারে ইসি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত