মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলো বেশিরভাগ সময় বাইরে নয়, সংঘটিত হয় ভেতরে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগাড় করা কঠিন, আরও কঠিন নিজের ভেতরের অভ্যাস, সামাজিক সংস্কার ও দীর্ঘদিনের শেখানো আনুগত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কারণ সমাজের তৈরি নিয়মগুলো ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরেই বাসা বাঁধে।
দেশ নাটকের প্রযোজনা পারো দেখতে দেখতে বারবার মনে হয়েছে, এটা একজন নারীর নিজের অস্তিত্বকে পুনরুদ্ধারের গল্প। এমন এক মানুষের গল্প, যে দীর্ঘদিন ধরে অন্যের সংজ্ঞায়িত পরিচয় নিয়ে বেঁচে থেকেও একসময় নিজেই নিজের পরিচয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। নাটকটি রচয়িতা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মাসুম রেজা।
জার্মান দার্শনিক হেগেল মনে করতেন, মানুষ শুধু খাদ্য, বস্ত্র কিংবা নিরাপত্তার জন্য বেঁচে থাকে না, মানুষ বাঁচে স্বীকৃতির জন্য। সে চায়, তাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হোক। সে চায়, তার অস্তিত্ব, অনুভূতি এবং সিদ্ধান্তের একটা মূল্য থাকুক। হেগেলের বিখ্যাত মাস্টার স্লেইভ ডায়ালেকটিক-এ দেখা যায়, মানুষের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা অন্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলানো নয়, নিজের মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি অর্জন করা।
পারোর কেন্দ্রীয় চরিত্র পারমিতার জীবনও এই স্বীকৃতিহীনতার ইতিহাস। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক সম্পর্কে—প্রতিটি জায়গায় তার সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করা হয় যেন তার ইচ্ছা, মতামত কিংবা অনুভূতির বিশেষ কোনো মূল্য নেই। সে যেন একজন মানুষ নয়, বরং একটি ভূমিকা, একটি দায়িত্ব। একটি বাধ্যতামূলক উপস্থিতি। কিন্তু মানুষ যখন নিজের স্বীকৃতি নিজেই দাবি করতে শেখে, তখনই পরিবর্তনের শুরু হয়। পারমিতার ভেতরেও জন্ম নেয় সেই পরিবর্তনের বীজ।
মনোবিশ্লেষক ও সমাজ দার্শনিক এরিক ফ্রম তার বিখ্যাত গ্রন্থ এস্কেপ ফ্রম ফ্রিডম-এ বলেছিলেন, মানুষ অনেক সময় স্বাধীনতা চায় না। কারণ স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব আসে, সিদ্ধান্ত আসে, ঝুঁকি আসে। ফলে মানুষ প্রায়ই নিরাপদ বন্দিত্বকে অনিশ্চিত স্বাধীনতার চেয়ে বেশি পছন্দ করে। পারো নাটকে এই সংকট অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপস্থিত।
সমাজ পারমিতাকে বলে, মানিয়ে নাও, চুপ করে থাকো, এভাবেই চলে, এভাবেই চলতে হয়। শুনতে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এ বাক্যগুলোই আসলে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক অস্ত্র। কারণ এগুলো মানুষকে প্রশ্ন না করতে, প্রতিবাদ না করতে, নিজের ভেতরের সত্যকে অস্বীকার করতে শেখায়।
পারমিতা দীর্ঘদিন সেই সামাজিক পরিচয়ের ভার বহন করে একসময় উপলব্ধি করে, অন্যেরা তার জন্য যে জীবন নির্ধারণ করেছে, সেটি তার নিজের জীবন নয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তার আত্মানুসন্ধান।
আমরা জানি, নাটক তখনই শিল্পের উচ্চতায় পৌঁছায়, যখন আপাত সরল গল্পের ভেতরে গভীর জীবনবোধ লুকিয়ে থাকে। সেদিক থেকে পারো সফল, পরিণত এবং চিন্তাপ্রসূত প্রযোজনা। আত্মমর্যাদার পক্ষে উচ্চারিত আরও একটি শিল্পিত ঘোষণা। এমন এক সময়ে নাটকটি নির্মিত, যখন মানুষ প্রায়ই নিজের সঙ্গে আপস করতে করতে নিজস্ব অস্তিত্বকেই হারিয়ে ফেলে। পারো সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আমাদের সামনে এক আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় তাকিয়ে আচমকা মনে হয়—এ তো পারমিতার গল্প নয়! এ আমাদেরও গল্প।
নাটকটি আমাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে—আমাদের জীবনের নিজ নিজ কোন অঞ্চলে আমরা নীরব, কোথায় আমরাও আপস করে চলেছি, অস্বীকার করে চলেছি নিজের সত্যকে। নাটক শেষ হওয়ার পরও এই ভাবনা দর্শকের মনে চলতে থাকে। অস্বস্তি তৈরি করে। ভাবায়। এখানেই পারোর সবচেয়ে বড় সাফল্য।