একটি ফ্রেমওয়ার্ক থেকে ডিজিটাল অগ্রগতি 

কোরিয়ার ই-গভ ফ্রেমওয়ার্ক সাফল্যের গল্প

আজ বিশ্বের ডিজিটাল সরকার র‍্যাঙ্কিংয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম সবার ওপরের সারিতে। ২০২৪ সালের জাতিসংঘ জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট সার্ভে তে** ১৯৩টি দেশের মধ্যে কোরিয়া সামগ্রিকভাবে চতুর্থ এবং অনলাইন সার্ভিস ইনডেক্স -এ প্রথম স্থান অর্জন করেছে। 

২০২৫ সালের ওইসিডি ডিজিটাল গভর্নমেন্ট ইনডেক্স-এ কোরিয়া সামগ্রিকভাবে প্রথম হয়েছে এবং উপাত্ত-চালিত সরকারি খাত, ডিফল্টভাবে উন্মুক্ততা ও সক্রিয়তা — এই তিনটি বিভাগেও শীর্ষস্থান দখল করেছে। 

কিন্তু এই সাফল্য রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের একটি নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত — সরকারি খাতের সব সফটওয়্যার প্রকল্পের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা, যার নাম ‘ই-গভফ্রেম  বা ই-গভর্নমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক’।

চল্লিশ বছরের সিঁড়ি: ইগভফ্রেম-কে বিচ্ছিন্ন একটি সাফল্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে কোরিয়ার প্রায় ছয় দশকের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সাম্প্রতিকতম স্তর — যে রূপান্তরের প্রতিটি দশক পরের দশকের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি — কৃষিনির্ভর, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো ও বিদেশি সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি নিয়ে। ১৯৬২ সালে মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল অনেক কম,উল্লেখ্য অনেক আফ্রিকান দেশের চেয়েও কম। 

১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি ক্ষমতায় আসার পর রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেন — পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, ইস্পাত , জাহাজ নির্মাণ ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো ভারী শিল্পে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, এবং বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলার নীতি। ১৯৬২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত কোরিয়ার গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ ছিল — ইতিহাসে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি "হান নদীর মিরাকল" নামে পরিচিত।
 
শিল্পায়নের পাশাপাশি একটি কম আলোচিত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ই-গভফ্রেম-এর ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৮০-৮১ সালে কোরিয়া সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ইলেকট্রনিক্স খাত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, যার একটি মূল সিদ্ধান্ত ছিল দেশীয়ভাবে ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ প্রযুক্তি (টিডিএক্স) তৈরি করা — আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব টেলিযোগাযোগ শিল্প গড়ে তোলার প্রথম বড় পদক্ষেপ।

এর সমান্তরালে সেমিকন্ডাক্টর গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো বৈশ্বিক চিপ জায়ান্ট গড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি করে। আশির দশকের প্রথম দিকেই কোরিয়া বিশ্বের একেবারে প্রথম দিককার টিসিপি/আইপি নেটওয়ার্কগুলোর একটি (এসডিএন) চালু করে — ইন্টারনেট যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

১৯৮৭ সালে সরকার "ন্যাশনাল বেসিক ইনফরমেশন সিস্টেম" প্রকল্প শুরু করে — নাগরিক নিবন্ধন, ভূমি রেকর্ড ও আর্থিক তথ্যের মতো মৌলিক সরকারি ডেটা ডিজিটাইজ করার প্রথম জাতীয় উদ্যোগ, যাকে আজকের ই-গভর্নমেন্টের প্রকৃত সূচনাবিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৯৫ সালে প্রণীত ও ১৯৯৬ সালে কার্যকর হওয়া "ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাক্ট অন ইনফরমেটাইজেশন প্রমোশন" এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী আইনি ভিত্তি দেয় — তথ্যায়ন নীতিকে আর প্রকল্পভিত্তিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বিষয়ে পরিণত করে। একই দশকে সিডিএমএ মোবাইল প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং হাই-স্পিড জাতীয় নেটওয়ার্ক নির্মাণ কর্মসূচি শুরু হয়।

১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর কোরিয়া সরকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় — সংকট থেকে উত্তরণের কৌশল হিসেবে ডিজিটাল অর্থনীতিতে ব্যাপক বিনিয়োগ। স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য কম্পিউটার ও ব্রডব্যান্ড সংযোগে ভর্তুকি, ১৯৯৮ সালে সরকারি ওয়েবসাইট চালু ও ই-গভর্নমেন্টের ১১টি মূল প্রকল্পের বাস্তবায়ন, এবং ২০০০-এর দশকের  কৌশল (আটটি প্রধান সেবা, তিনটি অবকাঠামো, নয়টি প্রবৃদ্ধি-চালক প্রযুক্তি) — এই ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোই কোরিয়াকে জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট রেডিনেস ইনডেক্সে ২০০৩ সালের ১৫তম অবস্থান থেকে ২০১০ সালে বিশ্বের শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার ই-গভফ্রেম তাই কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্ভাবন নয় — ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও নীতিগত ধারাবাহিকতার স্বাভাবিক পরিণতি: ১৯৬০-৭০-এর শিল্পভিত্তি ও শিক্ষার বিস্তার, ১৯৮০-র টেলিযোগাযোগ ও সেমিকন্ডাক্টর অবকাঠামো, ১৯৯০-র আইনি কাঠামো ও নেটওয়ার্ক নির্মাণ, এবং সংকট-উত্তর ২০০০-এর দশকের ডিজিটাল বিনিয়োগ — এই প্রতিটি স্তর একে অপরের ওপর ভর করে ২০০৯ সালে ই-গভফ্রেম-এর জন্ম দিয়েছে। 

যে সমস্যা থেকে যাত্রা শুরু সিদ্ধান্ত;

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি কোরিয়ার সরকারি খাতে একটি পরিচিত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে — যে সমস্যা আজ বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের সরকারি আইসিটি খাতে হুবহু দেখা যায়। 

প্রতিটি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার সংস্থা নিজের মতো করে সিস্টেম বানাত। একেক প্রকল্পে একেক ফ্রেমওয়ার্ক, একেক সংস্করণ, একেক ভেন্ডরের নিজস্ব (প্রোপ্রাইটারি) প্রযুক্তি এবং একেক রকম কোডিং পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো।

কোরিয়ার সরকারি ই-গভফ্রেম পোর্টালের নিজস্ব ব্যাখ্যায় সমস্যাটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে: ভেন্ডরদের ফ্রেমওয়ার্কগুলো "ব্ল্যাক বক্স" মডিউল হিসেবে সরবরাহ করা হতো, ফলে ভেন্ডরের কারিগরি সহায়তা ছাড়া সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করাই সম্ভব হতো না — অর্থাৎ সরকার নির্দিষ্ট ভেন্ডরের ওপর প্রযুক্তিগতভাবে জিম্মি হয়ে পড়ত। 

একাধিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহারের ফলে ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ, ডেভেলপার সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ — প্রতিটি ক্ষেত্রে  বিনিয়োগ (অতিরিক্ত বিনিয়োগ) করতে হতো। লগইন, নিরাপত্তা, রিপোর্টিং, ফাইল ব্যবস্থাপনার মতো একই মডিউল প্রতিটি প্রকল্পে নতুন করে বানাতে হতো। ফলাফল: ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল ইন্টিগ্রেশন, রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান ভেন্ডর-নির্ভরতা।

একটি জাতীয় প্রকল্পের ইতিহাস:কোরিয়া সরকার এই সমস্যাকে প্রকল্প ধরে ধরে সমাধানের চেষ্টা করেনি; বরং সমস্যার মূলে হাত দিয়েছে।
২০০৮-২০০৯ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বর্তমানে স্বরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় — মইস) এবং ন্যাশনাল ইনফরমেশন সোসাইটি এজেন্সি (এনআইএ)-এর নেতৃত্বে ই-গভফ্রেম-এর ডেভেলপমেন্ট সম্পন্ন হয় এবং ২০০৯ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়। শুরু থেকেই তিনটি নীতিগত সিদ্ধান্ত এই ফ্রেমওয়ার্ককে অতিদ্রুত গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে ।

প্রথমত, সম্পূর্ণ ওপেন সোর্স :’ই-গভফ্রেম’ কোনো ভেন্ডরের নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নয়, বরং স্প্রিং ফ্রেমওয়ার্ক -এর মতো বিশ্বব্যাপী পরীক্ষিত ওপেন সোর্স প্রযুক্তির  ভিত্তি করে  নিজস্ব কাস্টম ডেভেলপমেন্ট । 

দ্বিতীয়ত, জাতীয় পর্যায়ে মতামত সংগ্রহ :ফ্রেমওয়ার্কের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকভাবে শিল্প, একাডেমিয়া ও সরকারি সংস্থার মতামত নেওয়া হয়েছে — ফলে এটি কোনো একক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া মান নয়, বরং একটি জাতীয় ঐকমত্যের ফসল।

তৃতীয়ত, ধারাবাহিক বিবর্তন :২০০৯ সালের প্রথম সংস্করণ থেকে শুরু করে ফ্রেমওয়ার্কটি প্রযুক্তির প্রতিটি বড় ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আপডেটেড হয়েছে — মোবাইল যুগে মোবাইল ডিভাইস এপিআই, ক্লাউড যুগে ক্লাউড টেমপ্লেট, এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত ‘ই-গভফ্রেম ৫.০’ সংস্করণে ক্লাউড-নেটিভ আর্কিটেকচার, মাইক্রোসার্ভিস (এমএসএ) টেমপ্লেট এবং ভিএস কোড-সহ আধুনিক ডেভেলপমেন্ট টুল এর সাপোর্ট  যুক্ত হয়েছে। প্রায় ১৭ বছর ধরে একটি সরকারি ফ্রেমওয়ার্কের এই নিরবচ্ছিন্ন বিবর্তনই টেকসই ডিজিটাল নীতির প্রকৃত উদাহরণ।

প্রযুক্তিগত কাঠামো: চারটি পরিবেশ, ২৪০টি কমন কম্পোনেন্ট

ই-গভফ্রেম-এর আর্কিটেকচার চারটি এনভায়রনমেন্টে বিভক্ত এবং এই কাঠামোটিই এর সাফল্যের কারিগরি ভিত্তি:
১. রানটাইম এনভায়রনমেন্ট:সরকারি অ্যাপ্লিকেশনের বিজনেস  লজিক চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কমন মডিউলসমূহ — প্রেজেন্টেশন, বিজনেস লজিক প্রসেসিং এবং ডেটা প্রসেসিং স্তরের মানসম্মত অবকাঠামো।

২. ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট: ইক্লিপস-ভিত্তিক সমন্বিত ডেভেলপমেন্ট পরিবেশ, যাতে রয়েছে স্ক্রিন ডেভেলপমেন্ট টুল, কম্পোনেন্ট ডেভেলপমেন্ট টুল, ডেটা মডেলিংয়ের জন্য ইআরডি এডিটর, অবজেক্ট মডেলিংয়ের জন্য ইউএমএল এডিটর, জেইউনিট-ভিত্তিক টেস্ট অটোমেশন, কোড ইন্সপেকশন টুল, মেভেন-ভিত্তিক বিল্ড ব্যবস্থাপনা এবং কন্টিনিউয়াস ইন্টিগ্রেশন (সিআই) সার্ভার। অর্থাৎ কোড লেখা থেকে টেস্টিং, বিল্ড ও ডিপ্লয়মেন্ট — পুরো সফটওয়্যার লাইফ সাইকেল খুবই  মানসম্মত।

৩. অপারেশন এনভায়রনমেন্ট: সিস্টেম পরিচালনা ও মনিটরিংয়ের টুলসেট।

৪. ম্যানেজমেন্ট এনভায়রনমেন্ট:ফ্রেমওয়ার্কের সংস্করণ, স্ট্যান্ডার্ড ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার কাঠামো।

আর ই-গভফ্রেম-এর সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ হলো এর ‘কমন কম্পোনেন্টস’। সরকারি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৬টি সাধারণ প্রযুক্তিসেবা এবং ১০৪টি মৌলিক প্রযুক্তিসেবার জন্য মোট ২৪০টি পুনর্ব্যবহারযোগ্য কমন কম্পোনেন্ট তৈরি করা হয়েছে। ইউজার ম‍্যানেজম‍্যান্ট, অথেনটিকেশন, নিরাপত্তা, লগিং, ব্যাচ প্রসেসিং, রিপোর্টিং, মেইল, ফাইল ব্যবস্থাপনা, ইন্টিগ্রেশন সার্ভিস, মোবাইল ওয়েব ইউএক্স ও মোবাইল ডিভাইস এপিআই — এসব প্রতিটি প্রকল্পে নতুন করে বানানোর প্রয়োজন চিরতরে ফুরিয়ে গেছে। যে কোনো সংস্থা পোর্টাল থেকে ডাউনলোড করে সরাসরি ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি প্রকল্প আর বিচ্ছিন্ন (আইসোলেটেড) নয়,একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামোর অংশ।

সংখ্যায় সাফল্য: একটি জাতীয় ইকোসিস্টেমের জন্ম

ই-গভফ্রেম-এর প্রভাব আজ পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। সরকারি ইগভফ্রেম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত:
 - ৭,৩৮৫টিসরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে ফ্রেমওয়ার্কটি ব্যবহৃত হয়েছে;

 - ১৬,৯১৩ জন** ডেভেলপার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন; অনানুষ্ঠানিক সংখ্যাটি আরো  অনেক বেশি;
 - ফ্রেমওয়ার্কটি ১২ লাখ ২০ হাজারের বেশিবার ডাউনলোড হয়েছে;
  - ৫৩৬টি  সফটওয়্যার কম্প্যাটিবিলিটি সার্টিফিকেশন অর্জিত হয়েছে।

  - ই-গভফ্রেম ওপেন কমিউনিটি-তে যুক্ত আছেন হাজার হাজার  ডেভেলপার, যেখানে সেমিনার, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় ও কন্ট্রিবিউশন কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয়।

এই সংখ্যাগুলো শুধু একটি টুলের জনপ্রিয়তা দেখায় না; এগুলো একটি জাতীয় সফটওয়্যার ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠার প্রমাণ। যখন হাজার হাজার প্রকল্প একই ভিত্তির ওপর নির্মিত হয়, হাজার হাজার ডেভেলপার একই মানে প্রশিক্ষিত হন এবং শত শত সফটওয়্যার পণ্য কম্প্যাটিবিলিটি সার্টিফিকেশন অর্জন করে — তখন যে কোনো কোম্পানির ডেভেলপার যে কোনো সরকারি প্রকল্পে কাজ করতে পারেন, যে কোনো সিস্টেম অন্য সিস্টেমের সঙ্গে কথা বলতে পারে, এবং কোনো একক ভেন্ডর হুট করে চলে গেলে  কোনো সিস্টেম অচল হয়ে পড়ে না। এটিই প্রকৃত ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব।

তিন স্তরে প্রভাব: জি২জি, জি২সি, জি২বি

ই-গভফ্রেম-এর সুফল কোরিয়ার সরকারি পোর্টাল নিজেই তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছে:

১. সরকার-থেকে-সরকার (জি২জি): অভিন্ন ফ্রেমওয়ার্কের ওপর নির্মিত অ্যাপ্লিকেশন সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও আন্তঃসংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করে, ফলে আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। একটি মন্ত্রণালয়ের তৈরি কম্পোনেন্ট অন্য মন্ত্রণালয় সরাসরি পুনর্ব্যবহার করতে পারে।

২.সরকার-থেকে-নাগরিক (জি২সি): একাধিক সরকারি সিস্টেম পরস্পর সংযুক্ত হওয়ায় নাগরিকরা ওয়ান-স্টপ সেবা পান — জন্মনিবন্ধন থেকে কর, স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা — একবার তথ্য দিলেই কাজ হয়, বারবার নয়। কোরিয়ার গভর্নমেন্ট২৪-এর মতো সমন্বিত নাগরিক পোর্টাল এই ভিত্তির ওপরই সম্ভব হয়েছে।

৩. সরকার-থেকে-ব্যবসা (জি২বি): বাস্তবায়নকারী কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — বড় ভেন্ডরের একচেটিয়া প্রোপ্রাইটারি প্রযুক্তির দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো সরকারি প্রকল্পে সমান সুযোগ পেয়েছে। সরকারি পোর্টাল নিজেই এসএমই-দের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিকে ফ্রেমওয়ার্কের অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর ফলে কোরিয়ার স্থানীয় আইসিটি বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়েছে এবং সরকারি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বাজারেও রূপান্তরযোগ্য হয়েছে।

সীমানা পেরিয়ে: প্রযুক্তি রপ্তানি ও ডিজিটাল কূটনীতি

ই-গভফ্রেম-এর সাফল্য কোরিয়ার সীমানায় থেমে থাকেনি। ফ্রেমওয়ার্কটি উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে হওয়ায় ওয়ার্ল্ড স্মার্ট সাসটেইনেবল সিটিজ অর্গানাইজেশন (উইগো)-এর মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে — মেক্সিকো ও ভিয়েতনাম এইটাইপের ফ্রেমওয়ার্ক গ্রহণ করেছে ।কোরিয়া ২০১০ সালে মর্যাদাপূর্ণ ফিউচারগভ অ্যাওয়ার্ডস অর্জন করেছে। এনআইএ ও উইগো যৌথভাবে বিভিন্ন দেশের ডেভেলপারদের জন্য বিনামূল্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী রিমোট টেকনিক্যাল সাপোর্টও প্রদান করে।

অর্থাৎ একটি জাতীয় সফটওয়্যার ফ্রেমওয়ার্ক শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে কোরিয়ার ডিজিটাল কূটনীতি ও প্রযুক্তি রপ্তানির হাতিয়ার— কোরিয়ান কোম্পানিগুলো যখন বিদেশে ই-গভর্নমেন্ট প্রকল্পে কাজ করে, তারা একটি পরীক্ষিত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় প্ল্যাটফর্ম সঙ্গে নিয়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও কোরিয়ার ই-গভফ্রেম-কে বিচ্ছিন্ন সিস্টেমের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় আর্কিটেকচার গ্রহণের সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেষ কথা

কোরিয়ার ই-গভফ্রেম প্রমাণ করেছে, ডিজিটাল সরকার মানে শুধু পোর্টাল বানানো নয়; এটি একটি জাতীয় ডিজিটাল প্রোডাকশন সিস্টেম তৈরি করার বিষয়। যখন সফটওয়্যার স্ট্যান্ডার্ড, পুনর্ব্যবহারযোগ্য কম্পোনেন্ট, ওপেন আর্কিটেকচার, স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং স্থানীয় শিল্প ইকোসিস্টেম একসঙ্গে গড়ে ওঠে — তখনই ডিজিটাল গভর্ন্যান্স টেকসই হয়, সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ী হয়, নাগরিক সেবা মানসম্মত হয় এবং দেশীয় প্রযুক্তি শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করে।

১৭ বছর আগে কোরিয়া যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার ফসল আজ জাতিসংঘ ও ওইসিডি-র শীর্ষ র‍্যাঙ্কিং, ৭ হাজারের বেশি প্রকল্প, ডেভেলপার কমিউনিটি এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি রপ্তানি — কিন্তু সেই সাফল্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল আরও চার দশক আগে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দরিদ্র দেশের শিল্পায়নের প্রথম সিদ্ধান্তে। বাংলাদেশের সামনে আজ একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের সময়, যার সফলতা বড় অর্থনৈতিক বিপ্লবের হাতছানি। 

 লেখক: কোরিয়া প্রবাসী তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং টিকন সিস্টেম লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও।