রাষ্ট্র ও রাজনীতি কেন সর্বজনের হয়নি

আমাদের রাজনৈতিক উন্নয়ন কেন ঘটে না, এই প্রশ্নটি ফিরে ফিরে উঠে সংগত কারণেই। একাত্তরে যে প্রত্যয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটেছে সেই প্রত্যয় স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার হোঁচট খেয়েছে এবং এর ফলে শান্তিপ্রিয় মানুষের অনেক স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু তারপরও মানুষ বারবার  প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে। এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতা-পূর্ব স্বপ্ন-প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নের নাভিকেন্দ্র হিসেবে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর উচ্ছ্ব্াস সৃষ্টি করেছিল, ১৯৭২-এর সংবিধান সেই পথটাকে আরও আলোকিত করলেও সেই সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ মসৃণ থাকেনি। সর্বজনের সংবিধানে ক্ষয় ধরল, একই সঙ্গে সর্বজনের রাষ্ট্রের প্রত্যাশায়ও জং ধরতে শুরু করল। ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো ক্রমেই রাজনীতিতে দলীয় স্বার্থের সমীকরণে মেরুকরণ ঘটাতে থাকল এবং উচ্চারণসর্বস্ব রাজনৈতিক অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি সর্বজনের অধিকারের প্রতিকূল হতে থাকল। স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশকের অধিক সময় অতিক্রান্তে অধিকতর স্পষ্ট করে তুলল রাষ্ট্র, সংবিধান, রাজনীতি; কোনোটিই সর্বজনের হয়নি। এই আক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত রক্তস্নাত বাংলাদেশের জন্য বেদনা গাথা হয়ে দাঁড়াল, যা অনভিপ্রেত-অনাকাক্সিক্ষত।

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, শ্রেণিবৈষম্য এবং শোষণমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্র সর্বজনের হয়ে ওঠেনি। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো- সুবিধাভোগী শাসকগোষ্ঠীর প্রভাব, কার্যকর গণতন্ত্রের অভাব এবং সম্পদের অসম বণ্টন। এই কথাগুলো নতুন নয়, বরং সচেতন মানুষমাত্রই এর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত। স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ বারবার পরিবর্তনের লক্ষ্যে রাস্তায় নেমেছে, বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে প্রাণবিসর্জন দিয়েছে এবং এর সর্বশেষ মর্মস্পর্শী নজির চব্বিশের জুলাই-আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ জনস্বার্থের বিপরীতে হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থকরণের কম মর্মন্তুদ অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেনি। তবে এটা অসত্য নয়, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মানুষ এখন কিছুটা হলেও বেশি সচেতন; তাদের অচেতন করে রাখার নানারকম অপপ্রয়াস সত্ত্বেও। কিন্তু মানুষের এই সচেতনতাও কি রাজনৈতিক উন্নয়নের তাগিদে রাজনীতিকদের সজাগ করতে পেরেছে? এই প্রশ্নের উত্তর অন্তহীন নয়।

রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য মুখ্য ভূমিকা নেওয়ার কথা রাজনীতিকদেরই। স্বাধীন বাংলাদেশে এই তাগিদটা আরও জোরালো করেছিল একাত্তর-পরবর্তী অধ্যায়। একাত্তর আমাদের জাতীয় জীবনে বাঁক পরিবর্তনের গর্বিত অধ্যায়, যে অধ্যায়ের প্রেক্ষাপট রচিত হয় দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়। অনেক অঙ্গীকার ধারণ করেই তো একাত্তরের মহান অধ্যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল মুক্তি ও সমাজ বিনির্মাণ একই সঙ্গে জনকল্যাণের রাজনীতির পথ সুগম করা। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই তিনটির কোনোটির সফলতাই সর্বজনের ক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ওই মুক্তি এখনো বহুদূর, তা অনস্বীকার্য। মানুষের অধিকারের মাঠ আজও সমতল, উপরন্তু তা যেন আরও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ক্রমাগত এবং এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের ব্যর্থতার দায় এড়ানোর অবকাশ নেই। একাত্তরে সাম্য প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রমেই ফিকে হতে থাকল- রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ল, বৈষম্য আরও গভীর হলো, যা একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত।

ভোট সামনে রেখে জোট, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু রক্তস্নাত বাংলাদেশে ভোট উপলক্ষে জোট গঠনে রাজনৈতিক মেরুকরণের সমীকরণ অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, রাজপথে মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে, কিন্তু অনেক মিছিল গন্তব্য পৌঁছতে পারেনি, এক পর্যায়ে থেমে গেছে। এর জন্য যে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি দরকার, খুব দরকার; এর ব্যাপক ঘাটতিও ফিরে ফিরে দৃশ্যমান হয়েছে। আমাদের ভাঙাচোরা ভাবমূর্তি মেরামতে উজ্জ্বল হবে এই প্রত্যাশা বাদ দিয়ে এটা ভেঙে ফেলে, নতুন ভাবমূর্তি গড়ায় মনোনিবেশ সময়ের দাবি। ভেতর থেকে নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হলে সবার আগে জরুরি রাজনৈতিক উন্নয়ন। তবে সেটি এমনি এমনি ঘটবে না। এর জন্য রাষ্ট্র ও সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা বদলাতে হলে দেশপ্রেমিকদের কার্যকর ঐক্যেরও বিকল্প নেই। আমরা বারবার দেখেছি রাজনীতির মিছিলে যুক্ত হয়েও মিছিলকারীরা থেমে গেছেন, আবার মিছিলে শরিক হয়েছেন। কিন্তু ফের দেখা গেছে একই দৃশ্য। এই ব্যর্থতার দায় কার এ প্রশ্নের উত্তরও কঠিন নয়। নিশ্চয় এর জন্য রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা দায়ী। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকের মধ্যে কখনো কখনো নেতিবাচকতার উৎকট অপচ্ছায়া পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার রাজকীয় প্রদর্শনের কত দুঃসহ উদাহরণই আছে। রাজতন্ত্রের ইতিহাস নানাভাবেই রক্তরঞ্জিত ও কলঙ্কিত। অত্যাচারটা যে শুধু ভেতর থেকেই ঘটে তাই নয়, বাইরে থেকেও আসতে পারে এবং আসেও; যেমনটা ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকের শিবতরাইয়ের মানুষদের ক্ষেত্রে। ক্ষমতা সর্বদাই চায় আত্মপ্রকাশ করতে এবং শাসন করতে চায় জয় দেখিয়ে নয়, ভয় দেখিয়ে। এই অবস্থায় মানুষের মুক্তির পথ মসৃণ তো নয়ই, আরও অমসৃণ হয়ে যায়।

‘কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণ’ বাঙালি সমাজে প্রবাদটি বহুল প্রচলিত। ‘ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না’ এই প্রবাদটিও সমাজে বহুল প্রচারিত। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো কোনো দলের বলবানরাই কি অতীতে ভাত ছিটিয়ে এই ‘কাউয়া’দের আনেননি? নাকি তারা নিজেই ঠাঁই নিয়েছেন রাজনৈতিক ব্যানারের ছায়াতলে? যেভাবেই হোক, আবর্জনা খাওয়া কাকেরা ময়ূরপুচ্ছ ধারণ করে পাল্টে ফেলেছিল চেহারা, এও তো আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে। এখানেই শেষ নয়। ময়ূরপুচ্ছধারী কাকেরা এত বাঘা বাঘা নেতা-নীতিনির্ধারকদের চোখে ধুলা দিয়ে মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেল, অথচ কেউ টেরই পেলেন না! আমাদের নষ্ট-দূষিত-গলিত রাজনীতির যে শুদ্ধিকরণের অঙ্গীকার মিলেছে একেক সময় একেকভাবে, তা দেশের সাধারণ মানুষদের আশান্বিত করেছিল বটে, কিন্তু কার্যত সুফল মেলেনি। তারপরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, স্বপ্ন তো দেখতেই হবে, তা না হলে মানুষ দুঃস্বপ্নের থাবা থেকে বাঁচবে কী করে! উল্লেখ্য, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না; এ দেশের রাজনীতির বিপুল অর্জনও রয়েছে। বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর এরই দৃষ্টান্ত। কিন্তু স্বাধীন দেশে রাজনীতির অর্জনের বিসর্জন ঘটেছে বহুবার, এরই বিরূপ ফল বইতে হচ্ছে। ভবিষ্যৎ কি জনপ্রত্যাশা পূরণের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করবে?

কাজটি সহজ নয়, খুব কঠিন। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের রাজনীতিতে ‘সততা’ ও ‘আদর্শ’ শব্দ দুটি অনেকটা যেন ‘সোনার পাথর বাটি’র মতো। কোনো কোনো রাজনীতিকের নৈতিক স্খলন, তথাকথিত দেশপ্রেম এবং ‘সচেতন ধান্দাবাজ’দের জন্য গণতন্ত্র হয়েছে কলুষিত। যেসব কারণে কিংবা যাদের দ্বারা রাজনীতি পথ হারিয়েছে, তারা যেন গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল শক্তি জনগণের কাছে জবাবদিহির জরুরি বিষয়টি বিস্মৃত না হন। প্রত্যেকে নিজের পায়ে হাঁটেন, কিন্তু পথ কেউ একা তৈরি করেন না। পথ তৈরিতে অনেকের সাহায্য লাগে। স্বার্থপরতাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, তাকে আনা প্রয়োজন শৃঙ্খলার মধ্যে এবং যুক্ত করা জরুরি অন্যের স্বার্থের সঙ্গে। আর এখানেই চলে আসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভূমিকা। রাজনীতির ভুল সংশোধিত হতে হবে রাজনৈতিক পন্থাতেই।

সম্প্রতি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সম্মতি পাওয়ার পথ তৈরি হয় প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। মূল বিপত্তিটা ঘটেছে সেখানেই। গণতন্ত্র মানেই অধিকার ও সুযোগের সাম্য। ভোট মানুষকে এক ধরনের সাম্য দেয় এবং এ জন্য গণতন্ত্রের সঙ্গে ভোটকে অবিচ্ছেদ্য করে দেখা হয়। এই সাম্য নিশ্চিত করা অতি জরুরি। আবারও বলতে হয়, রাষ্ট্রের চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। রাষ্ট্র ভাঙল, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, কিন্তু অব্যাহত রইল মানুষকে পতঙ্গে পরিণত করার অপপ্রক্রিয়া! রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, এটা সাংবিধানিক স্বীকৃতি। রাষ্ট্র, সংবিধান, রাজনীতি হোক সবার কল্যাণে— এ প্রত্যাশা জারি আছে, থাকবেও। বহুমুখী সংস্কারের দাবি সমস্বরে না হলেও, ক্ষীণকণ্ঠে বহুবার উঠেছে। কিন্তু হালে পানি পায়নি। সংস্কার এক-দুই দিনের বিষয় নয় সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। সবার আগে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার। রাজনীতি যদি পরিশুদ্ধ হয় ও সঠিক পথে হাঁটে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত সম্ভব। জাতীয় ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐক্যের কথাও বহুবার আলোচনায় এসেছে, কিন্তু আকাক্সক্ষার ঐক্য আছে বলে মনে হয়নি। ঐক্যের ভিত্তি সবার আগে হবে আকাক্সক্ষা-ব্যবস্থা ও কর্ম। সর্বজনের রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে এর বিকল্প কি আছে? নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কেন আজও বৈষম্য ঘুচেনি, তা অন্তহীন প্রশ্ন হতে পারে না। রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশে স্বচ্ছ রাজনীতি ও রাজনীতিকদের দায়বদ্ধতার বিকল্প নেই। এ দুই ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি জিইয়ে রেখে রাজনীতির নানা মেরুকরণ হয়েছে। এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের কাছে নিবেদন, রাজনীতিকে আর পরাজিত করবেন না। আমাদের রাজনীতি সবচেয়ে বেশি পরাজিত হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং ব্যবস্থায় বহুবিধ ক্ষত জিইয়ে রাখার কারণে। এ সত্য ভুলে যাওয়াও অনুচিত, রাজনীতি ছাড়া যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো কিংবা জনঅধিকারের পথ থাকে রুদ্ধ। রাজনীতিতে যদি শিষ্টাচারের অনুশীলন না হয়, তাহলে রাজনীতির শ্রী পুনরুদ্ধার দুরূহ। রাষ্ট্র, সংবিধান, রাজনীতিকে যদি সর্বজনের জন্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দাগ আরও মোটা হয়, তবে এর অনুতাপে শুধু দেশের সাধারণ মানুষই পুড়বে না, রাজনীতিকরাও এ থেকে নিষ্কৃতি পাবেন না।

 

লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কবি

ফবনধথনরংযহঁ@ুধযড়ড়.পড়স