গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলে লাখ লাখ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক যন্ত্রাংশের অন্তত ২ হাজার ৫৯৬টি চালান পাঠিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থাটি বৃহস্পতিবার ‘মেংড ইন ইন্ডিয়া : দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপনস অ্যান্ড অ্যামিউনিশন টু ইসরায়েল’ শীর্ষক ৪২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের চালানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এসব চালান পাঠানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব চালানের মধ্যে ছিল মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, এলবিট সিস্টেমসকে দেওয়া ১৫৫ মিলিমিটারের উঁচুমাত্রার বিস্ফোরক কামানের গোলা, স্কাই স্ট্রাইকার ‘কামিকাজে’ ড্রোনের বিস্ফোরক ওয়ারহেড এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পাঠানো সাঁজোয়া যানের বিভিন্ন অংশ।
খান ইউনিসের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এ ধরনের উঁচুমাত্রার বিস্ফোরক ড্রোনের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অ্যামনেস্টির হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর মূল সরবরাহকারী বড় বড় কোম্পানিগুলোকে দেওয়া এসব চালানের মধ্যে ছিল ড্রোনের ওয়ারহেড ও কামানের গোলার খোলসহ ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি বিস্ফোরক উপাদান, ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি আগ্নেয়াস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ২৯৮টি সামরিক যানবাহনের অংশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের যোদ্ধাদের হামলার পর গাজায় অভিযান শুরু করে তেল আবিব। এরপর থেকে ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই পর্যন্ত গাজায় অন্তত ২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন।
অ্যামনেস্টির গবেষকরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শ্রেণিবিন্যাস বা ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ (এইচএস) কোড ব্যবহার করে এসব চালান বিশ্লেষণ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের অনুসন্ধানের তথ্যগুলো ‘রক্ষণশীল পদ্ধতি’ অনুসরণ করে বের করা হয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের প্রকৃত অবদানের পুরো চিত্র এতে উঠে নাও আসতে পারে। পণ্যগুলো সামরিক নাকি বেসামরিক তা নিশ্চিত হওয়া না যাওয়ায় কেবল অভ্যন্তরীণ পার্টস নম্বর থাকা শত শত চালান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপাদান মোট হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, দ্বিমুখী ব্যবহারের ছোট অস্ত্রের শত শত চালান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য সম্ভাব্য অস্ত্র, যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদও হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের প্রকৃত অবদানের পরিমাণ বাস্তবে আরও বেশি হতে পারে।
এর আগে গত মে মাসে ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ এবং ফিলিস্তিনপন্থি ‘বিডিএস’ আন্দোলন ভারত থেকে ইসরায়েলে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
পাশাপাশি ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলে সামরিক পণ্য রপ্তানিতে ভারত ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ।
অ্যামনেস্টি বলেছে, ভারতের ৯টি প্রতিষ্ঠান এবং ভারত সরকারের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। মানবাধিকার সংস্থাটির মহাসচিব আনিয়েস কালামার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যুদ্ধের ঝুঁকির কথা স্বীকার করে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়ার পর, ভারত সরকার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানত না বলে আর দাবি করতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, গাজায় চালানো অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনী যখন অনবরত মৃত্যু ও দুর্ভোগ বাড়াচ্ছিল, তখন ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতে উপাদান জুগিয়ে মুনাফা অর্জন করে গেছে। গত এক দশকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বে ইসরায়েলের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ভারত। পাশাপাশি বেশ কিছু ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে ভারতে কারখানা স্থাপন করেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী মোদির ইসরায়েল সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে ‘শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়। সম্প্রতি আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্রের ইন্টারসেপ্টর ভারতে তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।