বহু চেষ্টার পর পাওয়া টিকিট শেষ পর্যন্ত যাত্রার নিশ্চয়তা দেবে কিনা সে প্রশ্ন থাকে। বছরের পর বছর সরকার, পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নানা উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নিয়ম, প্রযুক্তি ও প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু যাত্রীর অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। দেখা যায়, যাত্রার আগের রাতে কারণ ছাড়াই টিকিট বাতিল করা হয়েছে। কাউন্টারে আগে থেকে বুক হওয়া আসন, বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। এমনও হয়, একজন যাত্রী নিয়ম মেনে অনলাইনে টিকিট কেটেছেন। কিন্তু যাত্রার দিন গিয়ে দেখেন তার নামে আসন নেই। সমস্যা প্রযুক্তির নয়। আসল কারণ হলো, এমন ব্যবস্থায় প্রযুক্তি বসানো হয়েছে যেখানে নিয়ম ভাঙার প্রণোদনা, নিয়ম মানার চেয়ে বেশি। গত কয়েক বছরে, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা কম হয়নি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহন। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল, রাজধানীর বাস চলাচলে শৃঙ্খলা আনা। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে, লোকসানের অভিযোগ তুলে একের পর এক বেসরকারি অপারেটর সরে যেতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন উদ্যোগ নেয় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। ২৬১০টি গোলাপি বাস, কাউন্টারভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা এবং একীভূত রঙের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, চালক ও শ্রমিকদের মজুরি সংক্রান্ত বিরোধ সামনে আসে। এরপর উদ্যোগটি এগোয়নি।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বিভিন্ন রুটে বাধ্যতামূলক ই-টিকিটিং চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু একই বছরের ঈদে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম প্রায় একই রকম ছিল। টিকিট বাতিল, অতিরিক্ত ভাড়া, যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তালিকায় নতুন কিছু যোগ হয়নি। অর্থাৎ প্রতিবার স্বচ্ছতা বাড়াতে নতুন ব্যবস্থা এসেছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর পথও থেকে গেছে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো, প্রয়োজনীয় তথ্য বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতার দিক থেকে পিছিয়ে থেকেছে। তবে একটি জায়গায় পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল টিকিটিংয়ের কারণে, প্রতিটি বুকিংয়ের নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হয়। কে, কখন টিকিট কিনেছেন, কোন আসন বরাদ্দ হয়েছে, পরে সেটি বাতিল হয়েছে কিনা এসব তথ্য আগের তুলনায় স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকছে। আগে যা প্রমাণ করা কঠিন ছিল, এখন অন্তত তথ্য থেকে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে গত এক দশকে গড়ে ওঠা ডিজিটাল টিকিটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে।
২০১৪ সালে টিকিটিং সেবাকে ডিজিটাল করার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘সহজ’। সময়ের সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা পাঁচ বছরের সরকারি চুক্তির আওতায় পরিচালনা করছে ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন’ প্রতিষ্ঠান। একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০০টিরও বেশি বাস অপারেটরের প্রতিদিন প্রায় ৮০- ৯০,০০০ টিকিট সহজের মাধ্যমে বিক্রি হয়। কিন্তু প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০০ বাসের টিকিটের মধ্যে মাত্র তিনটি অনলাইনে কেনা হয়। এই পরিসংখ্যানের দুটি দিক আছে। একদিকে এটি দেখায়, ডিজিটাল টিকিটিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অন্যদিকে এটাও স্পষ্ট করে, বাজারের বড় অংশ এখনো এমন একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু পুরো ব্যবস্থা এখনো সেই গতিতে এগোয়নি। তবে ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হওয়াই সমস্যার সমাধান নয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা ও সদিচ্ছা না থাকলে, প্রযুক্তির সুফল সীমিত থেকে যায়। প্রযুক্তি শুধু বুকিংয়ের কাজ করে না; পুরো ব্যবস্থার আস্থার চাপও বহন করে। আইন অনুযায়ী, বিআরটিএ প্রয়োজনে কোনো বাস অপারেটরের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কতটুকু প্রয়োগ হচ্ছে, সেটিই প্রশ্ন।
ঈদের আগে নিশ্চিত হওয়া বুকিং বাতিলের ঘটনা নতুন নয়। অনেক যাত্রী অর্থ ফেরত পান না, আবার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত হয় না। অথচ এসব ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স সংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান নজির কম। এখানেই সব সংস্কার প্রচেষ্টার অভিন্ন দুর্বলতা চোখে পড়ে। এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগে তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়নি। প্রথমত, অপারেটরের জবাবদিহি। দ্বিতীয়ত, একটি অভিন্ন তথ্যব্যবস্থা। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আয় ও কর্মপরিবেশ। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, নগদ লেনদেন কমে গেলে চালক, সহকারী ও কাউন্টারকর্মীদের অনানুষ্ঠানিক আয়ের উৎস কমে। অথচ তাদের পারিশ্রমিক কাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সংস্কার হয়নি। শুধু টিকিট বিক্রির পদ্ধতি ডিজিটাল করলে হবে না; যারা প্রতিদিন এই ব্যবস্থাকে সচল রাখেন, তাদের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার ‘দ্রুত টিকিট’ নামে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন টিকিটিং প্ল্যাটফর্ম চালু করে। লক্ষ্য ছিল, টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম হ্রাস এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। উদ্যোগটি ইতিবাচক। কিন্তু নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি ছাড়া ‘ডিজিটাল অবকাঠামো’ কেবল সমস্যার ওপর নতুন প্রযুক্তিগত স্তর যোগ করবে। নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরিতে বেসরকারি উদ্যোগ সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন সেই অবকাঠামোকে, কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করার দায়িত্ব সরকারের। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করে। কিন্তু মানুষের আস্থা তৈরি করে ন্যায়বিচার। সেই কারণে একটি টিকিটের মূল্য শুধু তার দামে নয়; মূল্য আছে নিশ্চয়তায়।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
sisharifkk@gmail.com