গ্যাস সংকটে দুর্ভোগের শেষ নেই চট্টগ্রামে

রবিবার বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম নগরীর কদমতলীর ফোর স্টার সিন্ডিকেট সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস নিতে লাইন ধরেছিলেন চালক মোহাম্মদ কামাল। কিন্তু তার সিরিয়াল আসতে আসতে ঘড়ির কাঁটায় সোমবার ভোর ৫টা। ১৪ ঘণ্টার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন গ্যাস দেওয়ার পালা এলো, ঠিক তখনই কমে গেল লাইনের গ্যাসের চাপ। টানা ১৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৫০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন তিনি।

সোমবার দুপুরে দেওয়ানহাট মোড়ে যাত্রী বিদায় করে ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরে বিশ্রাম নেওয়ার ফাঁকে বিষন্ন মনে কামাল বলেন, ‘এই ২৫০ টাকার গ্যাস দিয়া সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকার ভাড়া মারতে পারুম। এর মধ্যে অর্ধেকই তো গিয়া জমা দিতে অইব মালিকরে। পরিবার-পরিজন নিয়া কেমনে চলমু, কিছুই বুঝতে পারতেছি না।’

একই করুণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আরেক অটোরিকশাচালক মো. আলমগীরকেও। তিনি রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বহদ্দারহাট র‌্যাব কার্যালয়ের পাশের ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়ান। তখন তার অবস্থান থেকে পাম্পের দূরত্ব ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার। দীর্ঘ লাইন ঠেলে রাত ১২টায় যখন স্টেশনে পৌঁছালেন, ততক্ষণে পাম্পের চাপ তলানিতে। শেষমেশ ১৫০ টাকার গ্যাস নিয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে।

আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৫০ টাকার গ্যাস দিয়ে আমি ১ হাজার টাকার ভাড়া কাটতে পারব। কিন্তু মালিককেই জমা দিতে হবে ১ হাজার ২০০ টাকা। বাকি ২০০ টাকা পকেট থেকেই দিতে হবে।’

সে দিন নগরীর একে খান, আকবর শাহ, সিটি গেট, ওয়াসা মোড়, ষোলশহর কিংবা কদমতলির ফোর স্টার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের চিত্র এমনই ছিল। পাম্পগুলোর সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি গিয়ে ঠেকেছে দূর-দূরান্তে; কদমতলির লাইন পলোগ্রাউন্ড মাঠ পেরিয়ে পৌঁছে গেছে সিআরবি এলাকায়। যেখানে আগে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে জ্বালানি নেওয়া যেত, এখন সেখানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। অনেক চালককে গাড়ির ভেতরই ঘুমিয়ে রাত পার করতে দেখা গেছে। এতে তাদের আয় নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। গণপরিবহনও দেখা দিয়েছে সংকট। বাধ্য হয়ে অনেকেই যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করছে।

দুপুর ১২টার দিকে নগরীর নয়াবাজার বিশ্বরোড মোড়ে সিএনজির জন্য দীর্ঘ এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব জাকির হোসেন বলেন, ‘আমার শরীর খারাপ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। এক ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে আছি। কোনো সিএনজি পাচ্ছি না। দেওয়ান হাটগামী টেম্পো দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে, কিন্তু সেখানেও সিট খালি পাচ্ছি না। খুব বিপদে আছি।’

চকবাজার এলাকায় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী তাহেরা বিনতে মিজান বলেন, গাড়ির জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ভাড়া দ্বিগুণ নিয়েছে।

কেন এই সংকট? : চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ও বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি (৩৫০ মিলিয়ন) ঘনফুট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একসিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি ও আগুন লাগার ঘটনার পর থেকে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কমতে থাকে। ২২ জুলাই চট্টগ্রামে ছিল ২৩ কোটি ঘনফুট, যা গত শনিবার নেমে আসে ২১ কোটি ১৭ লাখে। পরিস্থিতি আরও করুণ আকার ধারণ করে শনিবার রাত থেকে। গতকাল সোমবার চট্টগ্রামে মিলছে মাত্র ১৯ কোটি ৪ লাখ (১৯৪ মিলিয়ন) ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ, প্রতিদিন চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেজিডিসিএলের বিপণন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ‘মূল সংকটের কারণ ঢাকার সরবরাহ ঠিক রাখা। জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রাম অংশের সরবরাহ কমিয়ে তা ঢাকায় বাইপাস করা হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামে সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।’

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, বিশেষজ্ঞ দল মহেশখালীর টার্মিনালে দিনরাত মেরামত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রফিক খান আশা প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামীকাল পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির দিকে যেতে পারে বলে আমরা আশা করছি।’

চুলা জ¦লছে না বাসাবাড়িতে, বন্ধের মুখে শিল্পকারখানা : টানা ১৩ দিন ধরে চলা এই সংকটে চট্টগ্রাম নগরের স্বাভাবিক জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। হালিশহরের আই ব্লক, বন্দর, আকবর শাহ, কোতোয়ালিসহ বিভিন্ন এলাকার বহু বাসাবাড়িতে দুই দিন ধরে চুলা জ¦লছে না। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ মাটির চুলায় রান্না সারছেন। আবার অনেকেই রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে আনছেন। ফলে খাবারের দোকানগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়।

হালিশহরের গৃহিণী রেবেকা হক বলেন, ‘সকালে অল্প আঁচে চুলা জ¦ললেও দুপুরের আগেই তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কাগজ জ্বালিয়ে কোনো মতে চা বানিয়ে খেয়েছি। দুপুরে বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে।’

কোতোয়ালির গৃহিণী শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘দুই দিন ধরে মাটির চুলায় রান্না করছি। এভাবে আর কতদিন চলতে হবে জানা নেই।’

শিল্প খাতেও তৈরি হয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয়। বিজিএমইএর পরিচালক ও শিল্প উদ্যোক্তা রাকিবুল আলম চৌধুরী পরিস্থিতিকে জরুরি চিকিৎসার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘মানুষের শরীরে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে যেমন তাকে আইসিইউতে নিতে হয়, জ¦ালানি সংকটে আমাদের শিল্পকারখানাগুলোর অবস্থা ঠিক তাই। আমাদের রেশনিং করে চালাতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে কারখানায় রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন চালু রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’

লোডশেডিং ৩০০ মেগাওয়াট ছাড়াল : গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট বরাদ্দের জায়গায় এখন দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে সার কারখানায় ৪৮ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৪২ মিলিয়নে নামানো হয়েছে।’

চট্টগ্রাম অঞ্চলে মোট ২৮টি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিনের বেলায় এসব কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৮১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।  চট্টগ্রামে ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ৯৫০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। এতে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করা হয়।

চট্টগ্রাম পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার বিকেলে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় কেন্দ্র থেকে মিলেছিল মাত্র ৯৫০ মেগাওয়াট। ফলে এক চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকাতেই প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’