গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অর্থনীতির ধকল টানছে বিএনপি সরকার

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। তাদের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের অর্থনীতি অনেকটাই ছিল স্থবির। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়া অর্থনীতির বাকি সব সূচক ছিল নেতিবাচক। এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। নতুন সরকার অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞরা।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নতুন সরকার আসার পর বেসরকারি খাতে স্বস্তির আভাস দেখা যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু খাতে প্রণোদনার ঘোষণাসহ জাতীয় বাজেটে খাতভিত্তিক বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটসহ আরও কিছু চ্যালেঞ্জ অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর পথকে বন্ধুর করে রেখেছে। বিভিন্ন খাতের শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো কাটেনি। সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী নিজে বিভিন্ন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। তারপরও অচলাবস্থা কাটছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতা এবং করনীতির স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে বিনিয়োগে আস্থার সংকট থাকবেই।

জানা গেছে, বন্ধ শিল্প কলকারখানা সচল করতে গঠন করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া চামড়া শিল্পের জন্য দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সহায়তা। রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনার হার ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নতি করা হয়েছে। এছাড়া নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে চাল, গম, আটা, ভোজ্য তেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, আদাসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানো হয়েছে। পাশাপাশি ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হাতে নিয়েছে সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচিত সরকারের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের মতো বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকেও সহসা মুক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে বেসরকারি খাত নিয়ে সরকার আন্তরিক হলেও সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকার অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেসরকারি খাতের প্রতি আন্তরিক। তাদের কাছে সরাসরি সমস্যাগুলো তুলে ধরা যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের আগ্রহও লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে ব্যবসা সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এখনো আশানুরূপ নয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির অবশ্য দাবি করেছেন, সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক বাধা কাটাতে কাজ করছে। সম্প্রতি একটি সভায় বলেন, ‘একটি ব্যবসা শুরু করতে যেখানে আগে প্রায় এক বছর সময় লাগত, সেখানে এখন মাত্র ১৪ দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আদর্শ পরিস্থিতিতে একটি কোম্পানি ১৫তম দিনেই যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারবে।’

অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বাজেট বক্তব্যে বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে নতুন যাত্রার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে জবাবদিহি, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের ওপর সরকার জোর দিচ্ছে।’

বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব ফেলছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের ওপরে। এটি ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি করছে। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা বজায় থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কিছুটা স্বস্তিতে রেখেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের মধ্যে রাত-দিনের পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪ এর আগস্টের সরকার নির্বাচিত কোনো সরকার ছিল না। জরুরি বা সংকটময় সময়ে তারা দেশের দায়িত্ব নিয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত সরকার। নতুন সরকার শিল্প উদ্যোক্তাদের সমস্যা শুনছে এবং সমাধানের উপায় চিহ্নিত করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এখনো সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের আন্তরিকতায় আমরা উদ্যোক্তারা খুশি। রপ্তানিমুখী শিল্প এবং শিল্প সহায়ক খাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। তবে দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট এখন আরও বেড়েছে। বিষয়টি সমাধানে আমরা সরকারকে চাপ দিচ্ছি। আশা করছি শিল্পোদ্যোক্তারা একটি কার্যকর সমাধান পাবেন।’

আমলাতন্ত্রের বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দীর্ঘদিনের। এটি একদিনে সমাধান হয়ে যাবে, এটা চিন্তা করা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে সেবার মানে উন্নতি হয়েছে। আশা করছি দেশের স্বার্থে আমলারা বেসরকারি খাতের পাশে থাকবেন।’

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা এফবিসিসিআইয়ের নতুন প্রশাসক মো. ফজলুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বেসরকারি খাতের প্রতি আন্তরিক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন জাতীয় বাজেটে প্রায় সব খাতের জন্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন এগুলোর বাস্তবায়ন দরকার। আমাদের প্রত্যাশা, উদ্যোক্তারা যেন সরকারের দেওয়া সুবিধা যথাযথভাবে এবং হয়রানিমুক্তভাবে পেতে পারেন। এ জন্য সরকার এবং আমলাদের একযোগে আন্তরিক হতে হবে। তা না হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশাও সেক্ষেত্রে পূরণ হবে না। তবে সুবিধা পেতে হলে শিল্পোদ্যোক্তাদেরও সরকারের পাশে থাকার প্রয়োজন রয়েছে।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেক বড় অনিশ্চয়তায় ছিল। এটা যেমন সত্যি, তেমনি এখন সেসব অনিশ্চয়তা কেটে গেছে, সেটিও আবার সঠিক নয়। বলা যেতে পারে, উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থনীতির অনেকগুলো সমস্যা বর্তমান সরকার পেয়েছে। যেমন ব্যাংকিং খাত, ঋণখেলাপি, নীতি সুদহার, বিদেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য। এসব বিষয় এখনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে, জ্বালানি সংকট। ফলে সরকার সুযোগ-সুবিধা দিলেও শিল্পমালিকরা সঠিকভাবে উৎপাদন করতে পারছেন না। এতে করে বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি আরও বেশি চেপে বসতে পারে। কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাও পিছিয়ে যেতে পারে।’

সরকারের দেওয়া সুবিধা উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’র অভিযোগের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অভিযোগ একেবারে সত্যি বা মিথ্যা বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো ঘোষণা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জটিলতা হয়ে থাকে। এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবে দেখতে হবে, সরকার নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যায় পর্যন্ত কাদের দায়িত্ব দিয়েছে। যথাযথ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া না হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা হওয়া স্বাভাবিক।’