বাংলাদেশে শিক্ষা-প্রযুক্তির প্রসারে যখন বড় বড় গ্লোবাল জায়ান্টরা বাজার দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন সম্পূর্ণ দেশীয় মানসিকতা ও বিশ্বমানের প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক নীরবে বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে ‘ব্যাকবোন লিমিটেড’। দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি কমিউনিটি স্কুল, কলেজ এবং প্রতিষ্ঠিত কোচিং সেন্টারে এখন যে স্মার্টবোর্ড শোভা পাচ্ছে, তার সিংহভাগই ব্যাকবোনের। বৈশ্বিক বাঘা বাঘা ব্র্যান্ডের ভিড়ে একজন দেশীয় উদ্যোক্তা কীভাবে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পালস বুঝে বাজার একচেটিয়া করে নিলেন তার উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যাকবোনের স্বত্বাধিকারী আব্দুল মতিন শেখের দূরদর্শী চিন্তা ও ব্যবসায়িক দর্শনে।
২০০৯ সালে ব্যাকবোনের যাত্রার সূচনা। এরপর ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানি হিসেবে এর নিবন্ধায়ন হয়। উদ্যোক্তা আব্দুল মতিন শেখ তখন জাপানে উচ্চশিক্ষারত। জাপানের নিখুঁত প্রযুক্তি-চর্চা ও কাজের শৃঙ্খলা কাছ থেকে দেখে তিনি অনুধাবন করেছিলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর আনতে হলে কেবল বিদেশি প্রযুক্তি এনে বসিয়ে দিলেই চলবে না; শিক্ষকদের মনস্তত্ত্ব, শ্রেণিকক্ষের বাস্তব পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয়তার সঠিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১৬ সাল থেকে দেশের শিক্ষাঙ্গনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মার্টবোর্ডের সংযোজন শুরু করে ব্যাকবোন।
শুরুর দিকে গ্লোবাল জায়ান্টরা অ্যান্ড্রয়েড-ভিত্তিক স্মার্টবোর্ড তৈরিতেই ব্যস্ত ছিল। কিন্তু ব্যাকবোন আলাদাভাবে চিন্তা করল। শিক্ষকদের জন্য কোনটা সত্যিই সুবিধাজনক? দেখা গেল, অধিকাংশ শিক্ষকের কাজের অভিজ্ঞতা উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে। ব্যাকবোন তাই বাজারে নিয়ে এলো উইন্ডোজ-ভিত্তিক হাই-কনফিগারেশনের স্মার্টবোর্ড। এতে শিক্ষকরা নোটিং সফটওয়্যার চালানো, জটিল গণিত বোঝাতে ‘ইমুলেটর’ ব্যবহার কিংবা বিভিন্ন শিক্ষা-সহায়ক সফটওয়্যার অ্যাপস ব্যবহারে শতভাগ কমফোর্ট জোনে চলে এলেন। ফলে অতি অল্প সময়েই ব্যাকবোনের নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ব্যাকবোনের এই রাজত্বের একটি স্পষ্ট চিত্র মেলে। বর্তমানে বাংলাদেশের মার্কেটে প্রায় ৫,০০০-এরও বেশি ব্যাকবোন স্মার্টবোর্ড সক্রিয় রয়েছে। চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই ৫,০০০ প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ জন ক্লায়েন্ট। অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ৩.৬ থেকে ৪টি করে বোর্ড ব্যবহার করছে। একটি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে রিপিটেড ক্লায়েন্ট বেড়ে যাওয়া মানেই পণ্যের প্রতি তাদের অগাধ আস্থা।
তবে কি কেবল প্রযুক্তির জোরেই ব্যাকবোন আজ এই জায়গায়? উত্তর হচ্ছে না। আব্দুল মতিন শেখ মনে করেন, আসল খেলাটা প্রযুক্তি বিক্রির পর শুরু হয়। বাজারে বর্তমানে ব্যাকবোনের ১০০ জনেরও বেশি দক্ষ কর্মীর একটি বড় সার্ভিস টিম কাজ করছে। সুদূর গ্রামের প্রান্তিক স্কুল হোক কিংবা শহরের নামিদামি কলেজ, পণ্য বিক্রির পরপরই শুরু হয় নিবিড় ট্রেনিং সার্ভিস। শিক্ষকরা যেন প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন, সে দায়িত্ব ব্যাকবোন নিজেই নেয়। উপরন্তু টানা ৫ বছর পর্যন্ত ক্লায়েন্টকে নিয়মিত ফলো-আপ সার্ভিস দেওয়ার নীতিতেই ব্যাকবোন অনন্য। গ্লোবাল সোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে জাপান, কোরিয়া বা কাজাখস্তানের মতো দেশ থেকে উপাদান সোর্স করা হলেও, কোম্পানিটি এশিয়ান ভ্যারিয়েন্টকে বেশি অগ্রাধিকার দেয় যেন স্পেয়ার পার্টস বা রক্ষণাবেক্ষণের সেবা ক্লায়েন্টের হাতের নাগাল থেকে দূরে না যায়।
ব্যাকবোনের প্রযুক্তি শুধু আধুনিক শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্লাসরুমেই সীমাবদ্ধ নয়; পৌঁছে গেছে গ্রামের কওমি মাদ্রাসা ও মক্তবেও। শৈশবে গ্রামে মক্তবে পড়া আব্দুল মতিন শেখ এখন তার সোশ্যাল করপোরেট রেসপন্সিবিলিটির অংশ হিসেবে ধর্মীয় ও প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ ডিসকাউন্টে এসব স্মার্টবোর্ড পৌঁছে দিচ্ছেন, যেন একদম শৈশব থেকেই বাচ্চারা আধুনিক ভিজ্যুয়াল শিক্ষার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে।
স্মার্টবোর্ডের বাইরেও শিক্ষা-প্রযুক্তিতে বহু দিগন্ত খুলে দিয়েছে ব্যাকবোন। ‘ক্যাসিও’ সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরের বৈপ্লবিক সাপোর্ট, ব্যাকবোন ‘এডুট্যাব’, আন্তর্জাতিকভাবে বহুল প্রশংসিত ‘এলসা’ এআই টিউটর কিংবা শিক্ষকদের দ্রুত লেসন প্ল্যানিংয়ের সাহায্যকারী ‘মজা বুক’ শিক্ষার সর্বস্তরে ব্যাকবোনের উপস্থিতি আজ স্পষ্ট। মান নিয়ন্ত্রণে কোনো আপস না করতে তারা এখন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টগুলোতে সরাসরি নিজস্ব স্টাফ রেখে কোয়ালিটি চেক নিশ্চিত করছে।
একটি উন্নত বাংলাদেশ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা আর দক্ষ শিক্ষক সমাজের বিকল্প নেই। গত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে মান ও কমিটমেন্টের ওপর ভর করে ব্যাকবোন লিমিটেড প্রমাণ করে চলেছে দেশীয় উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতা এবং সঠিক আফটার-সেলস সার্ভিস থাকলে বিশ^মানের প্রযুক্তি দিয়েও টেকসই বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।