ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা কাব্য

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

আষাঢ়-শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টি আর খালের আঁকাবাঁকা জলে ছাঁকা রোদের আলোছায়া এই দুইয়ের মেলবন্ধনে রূপসী বাংলার এক অনন্য রূপ দেখা যায় ঝালকাঠি ও বরিশালের সীমান্তবর্তী ভীমরুলী খালে। দক্ষিণাঞ্চলের এই খালজুড়ে এখন কেবলই পেয়ারার গন্ধ আর দূরদূরান্ত থেকে আসা ডিঙি নৌকার ব্যস্ততা। ৩৯ থেকে ৪০ কেজি ওজনের একেকটি মণ, কিন্তু খামারিদের ঘাম আর শত বছরের ঐতিহ্যের কাছে এই ওজনের পরিমাপ নিতান্তই কম। ২০০ থেকে ৩০০ বছরের বংশপরম্পরায় চলে আসা দক্ষিণঞ্চলের এই ভাসমান পেয়ারার হাট কেবল কৃষকদের জীবিকার প্রধান উৎসই নয়, হয়ে উঠেছে দেশের এক অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।

খালের জলে কেনাবেচার হাঁকডাক

সকালবেলায় বৃষ্টি কিংবা কড়া রোদ কোনো কিছুই দমাতে পারে না এই অঞ্চলের পেয়ারা চাষিদের। একদম কাকডাকা ভোরেই গাছে উঠে পেয়ারা পাড়ার যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় দুই মণ, আড়াই মণ, কিংবা পাঁচ মণ পেয়ারা সাজিয়ে চাষিরা ছোটেন ভীমরুলীর ভাসমান হাটে। ক্যারেট (টেরে) আর ঝুড়িতে ভরা তাজা, ফরমালিনমুক্ত সবুজ পেয়ারার পসরা নিয়ে খালের জলে জমে ওঠে বেচাকেনার ভিড়।

চলতি মৌসুমে পেয়ারার বাজার কিছুটা চাঙ্গা। প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়, যা কেজিতে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকার মতো। পাইকাররা ভাসমান হাট থেকে সরাসরি বড় বড় ট্রলারে করে এসব পেয়ারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কাঠের তৈরি এসব ট্রলার পেয়ারা সতেজ রাখতে দারুণ সাহায্য করে। এরপর ট্রলার থেকে সরাসরি ট্রাকে লোড হয়ে পেয়ারা চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, বরিশাল, ঝালকাঠিসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক শহরের বাজারে।

তাজা পেয়ারার স্বাদ

বর্ষার এই দিনে যখন অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরে বেড়ানো কঠিন, ঠিক তখনই ভীমরুলীর ভাসমান হাট হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রিয় ঠিকানা। দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এখানে এসে সরাসরি গাছ থেকে নিজ হাতে পেয়ারা পেরে খাওয়ার এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা লাভ করছেন। হাটের ভেতরে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, খালে স্নান করা আর ক্যারেটে সাজানো তাজা পেয়ারার ছবি তোলা যেন এক আলাদা আনন্দ। প্রতি বছরই এই হাটে পর্যটকদের আগমন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি এনে দিয়েছে।

পারিবারিক ঐতিহ্য

স্থানীয় চাষিদের কাছে এই পেয়ারা বাগান কেবল ব্যবসা নয়, তাদের অস্তিত্বের অংশ। বংশপরম্পরায় এই অঞ্চলের পরিবারগুলো পেয়ারা ও আমড়ার চাষ করে আসছে। তবে স্থানীয়দের মতে, পাইকারি বাজারে দাম কম হলেও শহরের খুচরা বাজারে এই পেয়ারাই কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এক কৃষক আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমরা গাছে উঠে ভিজে ভিজে পেয়ারা পাইরা আনি, এখানে ৫০০-৫৫০ টাকায় মণ দেয়। শহরের লোক সেই পেয়ারা অনেক দামে কেনে, কিন্তু আমাদের তো এই সামান্য দুই পয়সা বেশি পাওয়ার জন্যই লড়াই করতে হয়।’

কৃষকদের আশা, সরকারের দিক থেকে পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমবে এবং তারা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্যমূল্য পাবেন। তবে সমস্ত কষ্ট ছাপিয়ে, কোনো বিষাক্ত কেমিক্যাল বা ফরমালিন ছাড়া একদম প্রাকৃতিক স্বাদের এই ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা সারা দেশের মানুষের মুখে তুলে দিতে পারাতেই দক্ষিণাঞ্চলের পেয়ারাচাষিদের আসল সার্থকতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত