শূন্য থেকে কোটিপতি

ঠাকুরগাঁওয়ের হযরত আলীর হ্যান্ডিক্র্যাফট সাম্রাজ্য ও কর্মসংস্থানের গল্প

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা এক কিশোরের জীবন আজ অনুকরণীয় এক সাফল্যের গল্প। একসময় কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়তে হয়েছিল যাকে, সেই তরুণই আজ চার শতাধিক মেশিনের মালিক, গড়ে তুলেছেন ‘এইচ এ এস হ্যান্ডিক্র্যাফট’ (HAS Handicraft)। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিশ্রামপুর গ্রামের মো. হযরত আলী প্রমাণ করে দিয়েছেন সঠিক উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম আর সাহসিকতা থাকলে শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

১৯৯৮ সালের কথা। বর্ডারঘেঁষা ঠাকুরগাঁওয়ের ওই অঞ্চলে তখন কাজের দারুণ অভাব। বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য অনেকের মতো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাড়ি জমান হযরত আলী। সেখানে গিয়েই তার প্রথম পরিচয় ঘটে হস্তশিল্প বা হ্যান্ডিক্র্যাফট কাজের সঙ্গে। পরম নিষ্ঠায় কাজ শেখার পর তার মনে ভাবনা আসে পরের দেশে খেটে না মরে নিজ দেশের বেকারদের জন্য যদি কিছু করা যেত! সেই তাগিদ থেকেই খালি হাতে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

শুরুটা সহজ ছিল না। ঢাকাতে মাত্র চারটি মেশিন বানিয়ে তিনি হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেন। অনেকেই তখন টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন এসব হাবিজাবি জিনিস দেশে চলবে না। কিন্তু দমে যাননি হযরত আলী। তৈরি করা পাপশ ও কার্পেট নিয়ে ঢাকা নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে ঘুরে বিক্রি শুরু করেন। কিছুদিন পর যখন দেখলেন ঢাকার ফ্যাক্টরিতে তার নিজ এলাকার লোকেরাই কাজ করতে আসছে, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন ফ্যাক্টরি গ্রামেই স্থানান্তর করার। নিজ এলাকায় কাজ শুরু করলে এখানকার অভাবী মানুষের বেকারত্ব দূর হবে এই দূরদর্শী চিন্তাই তার ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

২০০৪ সালে দেশের ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড ‘আড়ং’-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় এইচ এ এস হ্যান্ডিক্র্যাফট। আড়ং-এ পণ্য সরবরাহ শুরুর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আড়ং ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন বড় বড় ব্র্যান্ডের মাধ্যমে তার তৈরি পণ্য এখন ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

বর্তমানে হযরত আলীর নিজস্ব ৫-৬টি ফ্যাক্টরির পাশাপাশি প্রায় ৪০০টি মেশিন রয়েছে। প্রতি মাসে তার বিক্রি প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। পাট, সুতা, ফেব্রিক্স এবং গার্মেন্টসের ঝুট দিয়ে তৈরি করা হয় পাপশ, শতরঞ্জি, কার্পেট, ওয়ালমেট ও টেবিলমেট। ৩০ টাকা দামের সাধারণ পাপশ থেকে শুরু করে ১৫,০০০ টাকা মূল্যের দৃষ্টিনন্দন কার্পেটও তৈরি হয় তার কারখানায়।

হযরত আলীর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তার এলাকার অর্থনীতি বদলে দেওয়া। তিনি শুধু নিজের কারখানাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, গ্রামের যেসব নারী ঘরের বাইরে এসে কাজ করতে পারেন না, তাদের বাড়িতে বাড়িতে প্রায় ১ থেকে ১৫০টি মেশিন বসিয়ে দিয়েছেন। ফলে গ্রামের গৃহিণীরা সংসারের কাজ সামলে অবসর সময়ে এসব কার্পেট ও শতরঞ্জি বানিয়ে বাড়তি আয় করছেন, যা সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের উন্নতিতে কাজে লাগছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তার মাধ্যমে এবং তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া অন্যান্য কারখানায় এলাকার হাজারেরও বেশি মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান হচ্ছে।

‘আমি সত্যি জিরো থেকে আজ হিরো। এখন কোটিপতি, আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো আছি’ তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলেন হযরত আলী। সাফল্যের পথ ধরে নিজস্ব জমি, বাড়ি ও গাড়ি করলেও তার মূল আনন্দ লুকিয়ে আছে এলাকার বেকারত্ব ঘোচাতে পারার মধ্যে।

ভবিষ্যতে নিজের তৈরি পণ্য সরাসরি নিজেই বিদেশে এক্সপোর্ট বা রপ্তানি করার বড় পরিকল্পনা রয়েছে তার। এ ছাড়া তার এলাকার যেসব প্রান্তে স্কুল-কলেজের অভাব রয়েছে, সেখানে একটি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এই সফল উদ্যোক্তা। ঝুঁকিমুক্ত কোনো ব্যবসায় যে সফলতা আসে না তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তরুণদের সাহসী হওয়ার পরামর্শ দেন ঠাকুরগাঁওয়ের এই গর্বিত শিল্পপতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত