‘পুকুর কিংবা মুক্ত জলাশয় ছাড়া হাঁস পালন অসম্ভব’ বহু দিনের এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ‘জান্নাত হ্যাচারি’। কোনো প্রকার পুকুরের পানি ছাড়াই কেবল খামারের বদ্ধ জায়গায় বা বাড়ির আঙিনায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে হাঁস পালন করে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে ফ্রান্স থেকে আনা বিশেষ জাতের হাঁস ‘পেকিন স্টার’।
সাধারণত হাঁসের কথা ভাবলেই ভেসে ওঠে বিলে বা পুকুরে দলবেঁধে ভেসে বেড়ানোর দৃশ্য। কিন্তু পেকিন স্টার জাতের হাঁসের ক্ষেত্রে বিষয়টি একদমই ব্যতিক্রম। এটি শুকনো বা পানিবিহীন পরিবেশে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। জেন্নাত হ্যাচারির উদ্যোক্তা জানান, সিরাজগঞ্জের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশি পেকিন স্টারের বাচ্চা সরবরাহ করে থাকেন।
মাত্র ৪০ দিনে ৩ কেজি প্লাস ওজন, প্রথম শুনলে যে কেউ থমকে যাবেন মাত্র ৪০ থেকে ৪২ দিনে একটি হাঁসের ওজন ৩ কেজি ছাড়িয়ে যাওয়া কীভাবে সম্ভব? কিন্তু পেকিন স্টারের ক্ষেত্রে এটিই বাস্তবতা। ব্রয়লার মুরগির মতো দ্রুতবর্ধনশীল এই জাতটি খামারিদের জন্য এক অভাবনীয় মুনাফার সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে পেকিন স্টার-১৩ জাতের পাশাপাশি বাজারে ‘পেকিন স্টার-৫৩’ নামে আরও একটি উন্নত জাত এসেছে, যা মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে সাড়ে ৩ কেজিরও বেশি ওজনে পৌঁছায়।
পুকুর ছাড়া যেভাবে করবেন চাষ। যাদের নিজস্ব কোনো পুকুর বা জলাশয় নেই, তাদের জন্য এই হাঁস চাষ এক আশীর্বাদ। শহরের বাড়ির ছাদ, পৈতৃক ভিটার আঙিনা কিংবা পরিত্যক্ত মুরগির খামারেই এই হাঁস পালন করা সম্ভব।
ঘর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা : হাঁসগুলো দিনের বেলায় ছায়াযুক্ত খোলা জায়গায় এবং রাতে ঘরে রাখা যায়। প্রতিদিন ঘরের বিষ্ঠা পরিষ্কার করা এবং এক পাশে খাবার ও অন্য পাশে পানির পাত্র রাখা জরুরি, যেন ঘর নোংরা না হয়।
সহজ লালন-পালন : ব্রয়লার মুরগি পালনের অভিজ্ঞতা থাকলেই এই হাঁস চাষ করা সম্ভব। ব্রিডিং, খাবার এবং প্রাথমিক যত্ন সবই মুরগির পদ্ধতির মতো।
রোগবালাই ও ভ্যাকসিন : ব্রয়লার মুরগির মতো এতে ঘন ঘন ভ্যাকসিন বা জটিল ওষুধ দেওয়ার ঝামেলা নেই। রানীক্ষেত বা গামবোরোর কোনো ভ্যাকসিন দিতে হয় না; কেবল ২১ দিনের মাথায় ‘ডাক প্লেগ’-এর একটি ইনজেকশন বা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলেই চলে।
মাংসের জন্য তৈরি করা হাঁসকে পানিতে নামানোর মোটেও প্রয়োজন নেই। তবে জেন্নাত হ্যাচারি যেহেতু নিজস্ব উদ্যোগে বাচ্চা উৎপাদন করে, তাই তাদের ‘মাদার’ বা প্যারেন্টস হাঁসগুলোকে প্রজননের সুবিধার্থে পানিতে নামানো হয়। পানিতে মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারলে ব্রিডিং ভালো হয় এবং ডিমের উর্বরতা ও বাচ্চার মান উন্নত থাকে।
বর্তমানে বিভিন্ন ডিলার কোম্পানির মাধ্যমে আসা বাচ্চার চেয়ে খামারিদের চাহিদা অনেক বেশি। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে জেন্নাত হ্যাচারি নিজস্ব মাদার হাঁস থেকে ডিম উৎপাদন করে এবং নিজেদের হ্যাচারিতেই বাচ্চা ফুটায়। পরে এই উন্নত জাতের বাচ্চা পৌঁছে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক খামারিদের হাতে।
পুকুরের বাধ্যবাধকতা না থাকায় শহরের ছাদ কিংবা গ্রামের ছোট আঙিনায় স্বল্প পুঁজিতে অল্প সময়ে পেকিন স্টার হাঁস পালন এখন এক প্রতিশ্রুতিশীল নতুন ব্যবসার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
