আদিবাসী দিবস পালিত

সরকার বদলালেও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি হয় না

সরকার বদল হয়, কিন্তু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির মালিকানা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয় না বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। তাদের মতে, পাহাড় ও সমতলে বিচারহীনতা, অন্যায্য জমি দখল ও বৈষম্যের কারণে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এখনো নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে গতকাল রবিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন। অনেকেই এসেছিলেন নিজস্ব রীতির পোশাক পরে। তাদের বর্ণিল পোশাকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বৈচিত্র্যময় এক আবহ তৈরি হয়। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’।

আলোচনা সভা শেষে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। পরে শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি তুলে ধরেন। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আদিবাসী দিবস উদযাপিত হয়েছে।

আলোচনা সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, ন্যায়বিচারের লড়াই কখনোই থেমে থাকে না। আজ না হলেও আগামী প্রজন্ম তাদের সঠিক পরিচয়, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়বে।

বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী ও ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির। তিনি বলেন, একের পর এক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও আদিবাসীদের অধিকারের চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অন্যায়ভাবে আদিবাসীদের জায়গাজমি দখল হয়ে যাচ্ছে, অথচ কষ্ট করে জমি উদ্ধার করলেও সরকারি নথিতে তা নিবন্ধিত হচ্ছে না। এনআইডিতেও আদিবাসী পরিচয় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সব নাগরিকের সমতা, স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ছাড়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সুফল কখনোই অর্জিত হবে না বলেও উল্লেখ করেন এই নারীনেত্রী।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির মূল বিষয়গুলো এখনো অকার্যকর। বর্তমান সরকারের প্রতি নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্ধারণের জোর দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জনকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পার্বত্য অঞ্চলেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় স্থায়ী শান্তি অর্জন ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীকে সরাসরি এই শান্তির প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি অকার্যকর ভূমি কমিশনকে দ্রুত সক্রিয় করে আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণসহ বছরের পর বছর ধরে চলা নির্যাতনের একাধিক ঘটনার বিচার আজও ঝুলন্ত। সুপ্রিম কোর্ট কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের কোনো পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নেই। পাশাপাশি কোটা কমিয়ে ১ শতাংশ করার সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে আদিবাসী কোটা পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার বলেন, ঔপনিবেশিক আমল থেকে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বজায় রাখা জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অস্বীকার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। দিবসটি সরকারিভাবে পালনের আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণেই পাহাড় ও সমতলে আজ বঞ্চনা বাড়ছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, আদিবাসীদের জায়গাজমি দখল, ভাষা-সংস্কৃতি বিলীন ও মৌলিক উন্নয়নের অভাব সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত পদক্ষেপে ব্যর্থতা দুঃখজনক। বাংলাদেশকে প্রকৃত বৈচিত্র্যময় রাখতে নতুন সরকারকে আদিবাসীদের ভূমি, সুপেয় পানি ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, যে রাষ্ট্র ‘আদিবাসী’ শব্দটি বলতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, পানির অধিকার ও অন্যান্য অধিকার দেবে এটা বিশ্বাস করা যায় না। আদিবাসীদের অধিকার দিতে না পারার বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার। আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে না।

সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকমল বড়ুয়া, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফী রতন, লেখক ও গবেষক ঈশিতা দস্তিদার, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন প্রমুখ।

আলোচনা সভায় আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো- আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এ লক্ষ্যে সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণা; সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন; আদিবাসীদের সম্পর্কে বিকৃত, খন্ডিত বা মিথ্যা তথ্য প্রচারকারী সব গণমাধ্যম, মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ; আদিবাসীদের ওপর সব নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধ করাসহ সব ‘মিথ্যা মামলা’ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে ইত্যাদি।

দেশের বিভিন্ন স্থানে দিবস পালন

দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা আয়োজনে আন্তর্জাতিক আদিবাসী পালিত হয়েছে। দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন

বান্দরবান: সকালে বান্দরবান আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির আয়োজনে রাজার মাঠ থেকে একটি র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজার মাঠে এসে শেষ হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।

রাঙ্গামাটি: বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম রাঙ্গামাটি অঞ্চলের উদ্যোগে রাঙ্গামাটি পৌর চত্বরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মঞ্চের সামনে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

খাগড়াছড়ি: আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে খাগড়াছড়িতে সমাবেশ ও শোভা যাত্রাসহ নানা আনুষ্ঠানিকতায় এ দিবস পালন করছে জেএসএস এমএন লারমা দল। এর আগে নিজেদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি তুলে ধরে বিভিন্ন ডিসপ্লে প্রদর্শন করেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নৃত্যশিল্পীরা। সকালে খাগড়াছড়ির চেঙ্গী স্কোয়ার থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে শহরের শাপলা চত্বর ঘুরে পান খাইয়াপাড়া মারমা উন্নয়ন সংসদে গিয়ে শেষ হয়।

পার্বতীপুর (দিনাজপুর): আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পার্বতীপুরে দিবসটি পালিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে শহর প্রদক্ষিণ করে। পরে দুপুর ১২টায় উপজেলা হলরুমে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

হবিগঞ্জ: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চুনারুঘাটে দিবসটি পালিত হয়েছে। চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে চিত্তরঞ্জন দেব বর্মার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী।

ঠাকুরগাঁও : র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রেস ক্লাব চত্বর থেকে র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে প্রেস ক্লাব হলরুমে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বগুড়া: মহানগরের সাতমাথায় নেচে গেয়ে ও বর্ণাঢ্য র‌্যালির মধ্য দিয়ে দিন পালন করেছে জেলা আদিবাসী ইউনিয়ন। সংগঠনটির জেলা কমিটির সংগঠনের সভাপতি শ্রীকান্ত মাহাতোর সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক অমল মাহাতোর সঞ্চালনায় জুলাই চত্বরে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আদিবাসী ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেবেকা সরেন।

রাবি : আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সমতল মান্দিদের জন্য পৃথক ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ চার দফা দাবি জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এ দিবস উদযাপন করেছে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। এ সময় ‘আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে’, ‘সমতল মান্দিদের জন্য পৃথক ভূমি করতে হবে’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে’ এবং ‘নিরাপত্তার নামে হয়রানি চলবে না’ এমন বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।

সাতক্ষীরা: অধিকার, মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার জোরালো দাবিকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হয়েছে। সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। দিনব্যাপী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ। কর্মসূচির শুরুতে আদিবাসীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়াসংবলিত একটি স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রদান করা হয়। শোভাযাত্রা শেষে কালেক্টরেট চত্বরে সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (শামস) আয়োজনে মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শামসের সভাপতি গোপাল মুন্ডার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণ মুন্ডা।