বিভাজনের পরিসর যেন না বাড়ে

চব্বিশের জুলাইয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটার পর দেশ আবার নতুন করে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পথে হাঁটতে শুরু করে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু কাঠামোগত সংস্কার অথবা আইনি প্রক্রিয়াই যে যথেষ্ট নয় সেটিই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের শর্ত হয়ে ওঠে। তবে অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরোনোর পরও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন আরও নাজুক হয়ে উঠতে শুরু করেছে। যে তরুণ প্রজন্ম এ আন্দোলনে একত্র হয়ে সংগঠক ও নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই দিশেহারা অবস্থায় রয়েছেন, এই অভিযোগ জনপরিসরে বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এমনকি জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মনোমালিন্য রয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতামূলক আচরণ দেখা গেলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভাজন-বিভেদ  যেন বাড়ছেই।

সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার যে উচ্চাভিলাষ জুলাইয়ে শুরু হয়েছিল তার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার ব্যবধান বাড়ার পেছনে গত দুই বছরের ঘটনাক্রম বিচার করে দেখা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনীব্যবস্থার সংস্কার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানিক জবাবদিহি পর্যন্ত, প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রকৃত অগ্রগতি সীমিত। এই পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিকভাবে হতাশার বিষয় নয়। বলা চলে, এটি আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর গভীর ত্রুটির সূচক। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্তত তিনটি সংকট স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। রাজনৈতিক সংহতির অভাব, অভ্যুত্থানের পর থেকে বিভিন্ন দলীয় স্বার্থ এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক স্বার্থে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে কোনো সুসংগত পরিবর্তন কর্মসূচি দৃশ্যমান হয়নি। যেসব প্রতিষ্ঠান আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার বিভাগ এগুলো এখনো কাঠামোগত স্তরে সংস্কার হয়নি। জননিরাপত্তাহীনতার কারণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

 সাধারণ মানুষ যখন দেখছে গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরেও শক্তিশালী পরিবর্তন আনা হয়নি, তখন তাদের মনে নিরাশা এবং সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক বিরূপ প্রভাব ফেলতে  পারে এবং ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দিতে পারে। সবার প্রথমে প্রশাসনিক স্তরেই সংকটগুলো বেশি দেখা যায়। স্থানীয় প্রশাসন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত, দক্ষতা এবং নির্ভরযোগ্যতার অভাব অনুভূত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাঠামো পরিবর্তন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখনো বিদ্যমান নির্বাচনী প্রক্রিয়া অব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতার অভাবে জর্জরিত। উপজেলা স্তরের নির্বাচন, পৌর নির্বাচন সব জায়গায় প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অথচ স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা  মেলেনি। পূর্ববর্তী সংকটগুলো এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছে যে নতুন সরকারও এগুলো কীভাবে সুরাহা করবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ভর করেছে। সামাজিক স্তরে এই অব্যবস্থা আরও বিপর্যস্ত। জুলাইয়ে শহীদ পরিবার এখনো ন্যায়বিচার এবং স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা না হয়ে, উল্টো সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা-ক্ষমতার তাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।  অভ্যুত্থানের পর জ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক অনুশীলন ও লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক ধারাকে উপড়ে ফেলার যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল তা এখন আর নেই। শিক্ষার্থীরা এখন বুঝতে পারছেন তাদের আন্দোলন শুধু ব্যবস্থার পরিবর্তন আনেনি, বরং নতুন ধরনের আনুগত্য এবং অধীনতার সৃষ্টি করেছে। তাই অনেক শিক্ষার্থী হতাশ হয়েই সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেশের অর্থনৈতিক স্তরে। উৎপাদনশীলতা এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম গতি পায়নি। দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগমুক্ত হতে পারেনি। এর ফলে ছোট উদ্যোক্তা থেকে বড় ব্যবসায়ীরা কমবেশি অসংগত নীতি ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের শিকার হচ্ছেন। কেন এমনটি হচ্ছে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রথমেই গঠনগত সমস্যার কথা বলতে হয়। আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং দলীয় স্বার্থের অধীন থেকেছে। এই কাঠামোগুলো এত গভীরভাবে বিকৃত হয়েছে যে, খুব দ্রুত এগুলো পুনরুজ্জীবিত করা কঠিন । নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা এখনো যেন একই মানসিকতা বজায় রেখেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাক্সিক্ষত মাত্রায় সফল নন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় করতে পারে না, তখন হাইব্রিড ব্যর্থতায় পরিণত হয়। এরপর দেখা দেয় সাংস্কৃতিক ও মানসিক সমস্যা। সমাজে যখন পারস্পরিক বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সফল হয় না। জুলাইয়ের আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের একটি বড় অংশ (বিশেষত তরুণরা) দেখেছে যে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার কথা এমন ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বার্থরক্ষা করতে পারে না। এই অভিজ্ঞতা থেকে এখন অনেকেই প্রতিষ্ঠান-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন পরিবর্তন শুধু আন্দোলনের মাধ্যমে আসতে পারে, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা নেতৃত্বের সংকট। অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বজনীন ভিশন ছিল না। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব সত্ত্বেও, নেতৃত্বের মধ্যে ঐক্য এবং লক্ষ্যের স্বচ্ছতা অনুপস্থিত তা লক্ষ করা গেছে। এই অবস্থায়, প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত পক্ষপাত বা স্বার্থের সন্দেহ নিয়ে আসে। সামাজিক  ন্যায়বিচার বা দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া, কোনো সরকারই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না। জুলাইয়ে যখন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন সাধারণ প্রত্যাশা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। শিক্ষার্থীরা  সম্পূর্ণ ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিলেন। তরুণরা বিশ্বাস করেছিলেন ওই  বিপ্লবী চেতনা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনতে পারবে।

বাস্তবতা ভিন্ন প্রমাণিত হয়েছে। প্রথাগত রাজনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত পুনরায় নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। যে নতুন নেতৃত্ব এসেছে, তারা আন্দোলনের চেতনা বুঝতে বা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন। পরিবর্তনগুলো যা আসছে, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্থায়ী এবং পৃষ্ঠপ্রাতিষ্ঠানিক। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা যদিও নতুন মুখ, কিন্তু তাদের পদ্ধতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি আগের মতোই অপ্রতুল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এই ব্যবধান তৈরি হয়েছে প্রধানত দুটি কারণে।

প্রথমত, বিপ্লবী মুহূর্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গতির মধ্যে একটি প্রাকৃতিক অসামঞ্জস্য রয়েছে। রাষ্ট্র কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের জন্য ডিজাইন করা নয়; এটি সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা। তরুণদের রাজনৈতিক ঐক্যের সাংগঠনিক ভিত্তি ওইভাবে গড়ে ওঠেনি। যদি গড়ে উঠত তাহলে আমরা হয়তো একটি সমন্বয়পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে এগোতে পারতাম। তা হয়নি বলেই বিতর্ক-অসামঞ্জস্য লক্ষণীয়। অভ্যুত্থানের দুই বছর পর জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও আমরা এমন এক ধরনের অস্বস্তিকর বিভাজন ও মতানৈক্য দেখতে পেয়েছি। এ পরিস্থিতি  উদ্বেগজনক। যদি রাষ্ট্রকাঠামো দ্রুত সংস্কার না হয়, তাহলে আগামীতে একাধিক ছোট সংকট তৈরি হবে যা বৃহত্তর সামাজিক অস্থিরতায় রূপান্তরিত হতে পারে। এরই মধ্যে এর অনেক আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এই সমাধান করবে? অবশ্যই রাজনৈতিক অংশীজনরা। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। স্বচ্ছ ও জবাবদিহির ভিত্তিতে তার সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার তথ্য দিতে হবে। যদিও নানা ক্ষেত্রে আমরা হতাশাই দেখেছি তবুও এক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। সেটি নির্ভর করছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর।

বর্তমান নেতৃত্বকে একটি স্পষ্ট এবং সীমাবদ্ধ সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে সংস্কারের  জন্য এবং পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কার শুধুই সরকারের একার কাজ নয়। সামাজিক সচেতনতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তরুণরা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যাওয়ার পরিবর্তে সেগুলোকে সংস্কার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন। একই সঙ্গে জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচারকে অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা যে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো গড়েছিল তাকে নতুনভাবে গড়তে হবে। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় তড়িঘড়ি বা ঘাটতি

থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এমনটি অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দেবে। রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের সেই অধ্যায় আমলে রাখতে হবে যে অধ্যায় পরিবর্তনের পথরেখা তৈরি করেছিল। আমাদের সামনে যেন স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান আর দীর্ঘ না হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে যেন আমরা ভুল না করি। জনঅধিকারের পথে যেন আর কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। দেড় দশকের দলীয়করণে বিধ্বস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও আমলাতন্ত্রকে রাতারাতি পুনর্গঠন করার অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে সম্পূর্ণ দলীয়করণমুক্ত করে সেবাধর্মী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার চ্যালেঞ্জ এ সরকারের ওপর বর্তেছে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে গভীর রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার এমন পরিবর্তন করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারের জন্ম হতে না পারে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনি, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এমনটি করতে না পারলে আবারও পুরনো ফ্যাসিবাদের চর্চা ফিরে আসতে পারে। তাতে অভ্যুত্থানের স্পিরিটই নস্যাৎ হবে।

লেখক : জনপ্রশাসন-স্থানীয় সরকার-রাজনীতি বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ।