রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট কীভাবে নেওয়া হবে, তা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে ইসি সচিব বলেন, ভোটের জন্য (সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানিয়ে) সংসদ কক্ষে বৈঠক আহ্বান করেছেন সিইসি। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করছি।’
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতে পদত্যাগ করেন। এ পদে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইতিমধ্যে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন ভবনে ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই ১৬ আগস্ট ও প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট এবং সংসদ কক্ষে ভোট ২০ আগস্ট।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থীর পাশাপাশি বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেবেন প্রার্থীরা। ৩৫ বছর পর সংসদ অধিবেশন কক্ষে ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে। এ জন্য বৈঠক আহ্বান করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন; যিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী এ ভোট হচ্ছে।
নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচনী কর্তাকে সহায়তায় ইসির ২০ জন সহায়ক কর্মকর্তা থাকবেন, সঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়েজিত হবেন। চার নির্বাচন কমিশনারও ভোট দেখতে সংসদে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদে ৩৪৯ জন সদস্য রয়েছেন, যার মধ্যে ৫০ জন সংরক্ষিত আসনের। চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থিতা বাতিল হয় আদালতে। সংসদ সদস্যরা এ নির্বাচনে ভোটার, ইতিমধ্যে বিভক্তি সংখ্যাসহ ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি। এ সংসদে বিএনপির ২৪৭ জন সদস্য থাকায় ক্ষমতাসীন দলটির প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। তবুও বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় ভোটে গড়াল এবার।
‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ২০২৬’ উপলক্ষে গতকাল সকালে সংসদ ভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়। এতে চিফ হুইপ, সরকারি ও বিরোধীদলীয় হুইপ, সংসদ সচিবালয় সচিব ও নির্বাচন কমিশন সচিব অংশ নেন। বৈঠক শেষে নির্বাচন ভবনে এসে ভোট প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ বিরতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে ২০ আগস্ট। শুরুতে সরাসরি সম্প্রচার হবে এবং সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত ব্যবস্থা থাকবে। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে। ভোটদান পদ্ধতি বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ আসনে বসবেন। নির্বাচনী কর্তার সঙ্গে আমরা যারা সহায়ক কর্মকর্তা থাকব, আমরা তাদের কাছে ব্যালট পেপারটা পৌঁছে দেব। সংসদ সদস্যরা প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারের পূর্ণ স্বাক্ষর ও বিভক্তি সংখ্যা লিখে ব্যালট পেপার বাক্সে রাখবেন।
ইসি সচিব জানান, প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর বিধিমালা অনুযায়ী ব্যালট পেপারটা ছাপাবে ইসি। ব্যালট পেপারে দুটি পার্ট। একটি চেকমুড়ি আর একটি হচ্ছে ভোটের ব্যালট। মুড়িতে চারটি তথ্য থাকে ব্যালটের ক্রমিক, যিনি ভোটার তার নাম, বিভক্তি নম্বর আর স্বাক্ষর করে ব্যালটটা নিতে হবে। আর ডান দিকের সাইডটা যেটা ব্যালট, সেই ব্যালটটায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তাদের নামটা থাকবে। তার পাশে স্পেস দেওয়া আছে, সেই স্পেসে ভোটার পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। তিনি জানান, এবার সংসদ কক্ষে তিনটি ভোট কাউন্টার ও তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হবে। যেকোনোটায় সংসদ সদস্য নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী কাছের কোনো একটা বাক্সে ব্যালট ফেলবেন। সংসদ কক্ষে ভোট গণনা শেষে দ্রুত ফল ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশের ব্যবস্থা নেবে ইসি। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট ব্যবস্থাটা রাখতে হবে। কারণ যদি কোনো অনির্ধারিত কারণে কোনো সংসদ সদস্য এসে পৌঁছাতে দেরি করেন, তাহলে সেই জিনিসটা যেন ৫টা পর্যন্ত কন্টিনিউ করে।
সচিব বলেন, যখন ভোটগ্রহণ শেষ হবে, তাৎক্ষণিকভাবে ওখানে কাউন্টিংটা করা হবে। ব্যালট হচ্ছে ৩৪৯টি। বৈধ কয়টি কাস্ট হয়েছে, প্রার্থীদের ফলাফলটা ওখানে সংসদে করবেন সিইসি। প্রাথমিক ফলটা ওখানে ঘোষণা করা হবে। ইসি সচিবালয়ে গেজেটটা করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকরী থাকবে চিফ হুইপ : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকরী থাকবে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র দাখিল ও বাছাই শেষে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট রাত ১২টা। সরকারি দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন এবং মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আজকের (মঙ্গলবার) বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ করা হবে। সংসদ সদস্যরা তাদের আসন ও বিভক্তি নম্বর অনুযায়ী ভোট দেবেন।’
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকারের ভোট দেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ দেওয়া হবে। ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট গণনা ও ফল প্রস্তুতের কার্যক্রমও সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে।’
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে মোট ৩৪৯ জন ভোটার রয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোটগ্রহণ শেষ হলে গণনা শেষে ফল ঘোষণা করা হবে। তবে কোনো ভোট বাকি থাকলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফল ঘোষণা করা হবে।
চিফ হুইপ জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন এবং সংসদ সচিবালয় তাদের সাচিবিক সহায়তা দেবে।