বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দাবিমতো চাঁদা না পেয়ে আবারও গুলির ঘটনা ঘটিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গত সোমবার রাত ১১টার দিকে নগরের হামজারবাগ এলাকায় ‘রুনা টাওয়ার’ নামে ১১তলা ভবনে এই ঘটনা ঘটে। ভবনটির দারোয়ান মো. আলমগীর জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে দুই যুবক বাড়ির সামনে আসে। এ সময় তাকে ভেতরে রেখে গেট বন্ধ করে দিতে বলে তারা। এরপরই গেট লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছুড়ে হেঁটে চলে যায় তারা। খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে আসে। চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রামে একের পর এক ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
হামজারবাগ এলাকার এই ঘটনাটি এমন সময় ঘটল যখন চট্টগ্রামজুড়ে চাঁদা না পেয়ে একাধিক বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে গুলিবর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন পুলিশের রিমান্ডে। ভবনটির মালিক ইউসুফ সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার আগে সামবার দুপুর ১২টার দিকে এক ঘণ্টা সময় দিয়ে তার ছেলে শওকতের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ভয়েস বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ইউসুফের ছেলেমেয়েরা কোথায় কী করেন, তাদের জীবনবৃত্তান্ত এবং কোথায় কোথায় বাড়ি আছে, সবই তাদের জানা। এক ঘণ্টার মধ্যে বড় ভাইয়ের কথামতো ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। না হলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
সবশেষ গত ২৬ জুলাই ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় হাটহাজারী থানায় মামলা দায়ের হলেও একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। অবশ্য ওই মামলায় সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) তারেক আজিজ।
পুলিশ জানায়, গত ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদার জন্য নগরে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এই দুটি ঘটনায় ডেভিড ইমনের অনুসারীরা ঘটায় বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে মোস্তাফিজুর রহমান নামের শীর্ষ এক ব্যবসায়ীর বাসা লক্ষ্য করে সাব মেশিনগান, চায়নিজ রাইফেল, শটগান এবং পিস্তল দিয়ে এক ডজনেরও বেশি গুলি ছোঁড়া হয়। এ ঘটনায় চারজন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও অস্ত্রধারী শুটারদের কেউ এখনো ধরা পড়েনি।
হামজারবাগ এলাকায় চাঁদা না পেয়ে একটি ভবনের গেট লক্ষ্য করে গুলি করা প্রসঙ্গে পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় যারা জড়িত, তা শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে ঘটনায় এখনো থানায় মামলা হয়নি।’ এদিকে সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন বর্তমানে পুলিশ রিমান্ডে থাকা অবস্থায় চাঁদা না পেয়ে ফের ব্যবসায়ীর বাড়ির গেটে গুলির ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ডেভিড ইমনের অনুসারীরা হামজারবাগে বাড়ির গেটে গুলির ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে।
ভবনর মালিক ইউসুফ বলেন, ‘চাঁদার টাকা না দেওয়ার কারণে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে যেভাবে বাড়ির গেটে গুলি চালিয়েছে, সেটা খুবই উদ্বেগের। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। ’ নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও হুমকির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশকে অবহিত করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার অনুসারীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
গত ২৯ জুলাই সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে তিন সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। পুলিশ জানায়, ডেভিড ইমন ফটিকছড়ি থানার হত্যা ও অস্ত্র মামলায় আদালতের নির্দেশে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে করছে জেলা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ইমন জানিয়েছেন, তিনি প্রতিমাসে গড়ে এক থেকে সোয়া কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতেন। চাঁদার টাকার অর্ধেক পাঠিয়ে দিতেন ‘গুরু’ বিদেশে থাকা পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলীর কাছে। বাকি টাকা তিনি নিজের কাছে রাখতেন।
ডেভিড ইমন জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ডেভিড ইমনের অনুসারীরা চাঁদাবাজির আগে ব্যবসায়ীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেন। এরপর তারা চিহ্নিত ব্যবসায়ী ও তার পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করেন। তথ্য পাওয়ার পর বিদেশি নম্বর থেকে ব্যবসায়ীকে ফোন করতেন ডেভিড ইমন। ভয় দেখানো হতো গুলি করার এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার। কথামতো টাকা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হতো। তবে এখন সে কারাবন্দি বা পুলিশ হেফাজতে থাকায় বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা চাঁদা না পেয়ে গুলির ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন ডেভিড ইমন।
সূূত্রটি জানায়, ব্যবসায়ী বা প্রবাসীদের মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হতো চাঁদার জন্য। এরপর বাহকের মাধ্যমে নগদে সংগ্রহ করা হতো চাঁদাবাজির টাকা। চাঁদা চাওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির আয়ের উৎস, বর্তমান সম্পদ, নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন ইমন কিংবা বড় সাজ্জাদের লোকজন। তথ্য সংগ্রহের জন্য এলাকাভিত্তিক সোর্স রয়েছে তাদের। তথ্য সংগ্রহের পর চাঁদার জন্য বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করা হয় নির্ধারিত ব্যক্তিকে। কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কে কোথায় থাকেন, কী করেন, সব জানানো হয়। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে হামলার ঘটনাও ঘটে।