৪০০ শয্যায় ১০০ শয্যার জনবল

জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতাল ৪০০ শয্যায় উন্নীত হলেও চিকিৎসাসেবা চলছে ১০০ শয্যার অনুমোদিত জনবল দিয়েই। চিকিৎসক-নার্স সংকটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ফলে কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও অন্য জেলার হাসপাতালগুলোতে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের রোগীরা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পর্যায়ক্রমে ২০২৩ সালে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয় হাসপাতালাটি। ২৫০ শয্যার অনুমোদন দেওয়া হলেও ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই ধুঁকে ধুঁকে চলছিল চিকিৎসাসেবা। এর মধ্যে চলতি বছরের জুলাইয়ে হাসপাতালটিকে ৪০০ শয্যায় উন্নীত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু আগের সেই ১০০ শয্যার হাসপাতালের জনবল ও যন্ত্রপাতি দিয়েই চলছে চিকিৎসাসেবা।

ভৌগোলিক সীমারেখা ও যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় জয়পুরহাট জেলার পাশাপাশি আশপাশের অন্যান্য জেলা নওগাঁর বদলগাছী, ধামইরহাট, দিনাজপুরের হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট, বগুড়ার শিবগঞ্জ থেকেও প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসে হাসপাতালটিতে। কিন্তু চিকিৎসক, জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। প্রায় চার বছর আগে আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হলেও চিকিৎসক সংকটে এখনো তা চালু হয়নি। নেই সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় দেখা মিলে না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। বাধ্য হয়ে রোগীদের স্থানীয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জটিল রোগীদের পাঠানো হচ্ছে অন্য জেলায়। এতে রোগীদের দুর্ভোগ ও খরচ আরও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। বছরের পর বছর ধরেই এসব সমস্যা চললেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। দ্রুত চিকিৎসক, জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের দাবি রোগী ও স্বজনদের।

এ হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে রোগী ভর্তি থাকে ৭০০-৮০০ জন। সম্প্রতি খাবার সরবরাহ হচ্ছে ৪০০ শয্যার। প্রতিদিন গড়ে আউটডোরে চিকিৎসা নেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ রোগী। ৪০০ শয্যার হাসপাতালে কর্তৃপক্ষ চাহিদা দিয়েছে ৩০৫ জন চিকিৎসকের। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৪৪ জন চিকিৎসক কর্মরত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নার্সের চাহিদা দিয়েছে ২২৪ জনের। তবে বর্তমানে হাসপাতালে নার্স কর্মরত আছেন মাত্র ১২৪ জন।

চিকিৎসা নিতে আসা পাঁচবিবি উপজেলার শিরোতা গ্রামের রুস্তম আলী ও ক্ষেতলাল উপজেলার কুসুম শহর গ্রামের মহসিনা খাতুন জানান, এই হাসপাতালটি নামেই ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট। দূর-দূরান্ত থেকে এখানে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আসে রোগীরা। কিন্তু চিকিৎসকরা শুধু প্রেসক্রিপশন হাতে ধরিয়ে দেন। এখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। ওষুধপত্র সব বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে করাতে হয়।

কালাই উপজেলার বাইগুনি গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে এসে যদি সেবা না পাই, তাহলে কোথায় যাব? টাকা দিয়েই যদি সব কিনতে হয় তাহলে সরকারি হাসপাতালে কেন আসব? যখনই ডাক্তারদের ব্যক্তিগত চেম্বারে যাওয়া হয়, তখনই ভালো সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু হাসপাতালে সেই সেবা নেই। ভালো বেডসিট, থাকার পরিবেশ নেই। হাসপাতালের মেঝে-বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। রোগীদের ভর্তি করালে অনেক সময় ২-৩ দিনেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রোগীকে দেখতে আসেন না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক বলেন, ‘এই হাসপাতালের ইনডোরে ৭০০ এর বেশি রোগী ভর্তি থাকে। আউটডোরে দেড় হাজারের বেশি রোগী দেখতে হয়। ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই ৪০০ শয্যার হাসপাতাল চালাচ্ছি। তবে ৪০০ বেডের খাবার দেওয়া হচ্ছে। সিটিস্ক্যান, এমআরইসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির চাহিদা দেওয়া হয়েছে। আইসিইউ ইউনিট নির্মাণের পর নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে গত ৪ বছরেও আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জনবল চেয়ে চিঠি দিয়েছি। পর্যাপ্ত জনবল পেলে রোগীদের কাক্সিক্ষত চিকিৎসা দিতে পারব।’