টেকনাফে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আতঙ্ক

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়, সীমান্ত ও মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্যের আড়ালে এখন সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ‘অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত তৎপরতার পরও থামছে না এই চক্রের দৌরাত্ম্য। গত বুধবার সন্ধ্যায় টেকনাফের হ্নীলা থেকে অপহৃত হন স্থানীয় দর্জি মোহাম্মদ মোস্তাক। ১০ লাখ টাকা দাবি করলেও পরিবারের আকুতি-মিনতির পর গত শনিবার রাতে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পান তিনি। পরিবারটি সর্বস্ব দিয়ে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর গহিন পাহাড়ে রোহিঙ্গা কিশোর গ্যাংয়ের একটি আস্তানা রয়েছে, সেখান থেকে মোস্তাককে উদ্ধার করা হয়। টাকার মিনিময়ে ছেড়ে দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কিছু জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ওই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয়রা জড়িত।

গত ৬ আগস্ট কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, টেকনাফ ও উখিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং নৌপথ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। সিন্ডিকেট নির্মূলে সেনাবাহিনীর রামু পদাতিক ডিভিশনের জিওসির নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সকে শীর্ষ মাদক কারবারি, মানবপাচারকারী, অপহরণকারী ও অপরাধের মূল হোতাদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। এ তালিকার ভিত্তিতে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সিসি ক্যামেরা ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে এবং ক্যাম্পের ভেতরে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এক বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে মুক্তিপণ দিতে না পেরে কিংবা নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫ জন। ফলে দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র চক্রের ত্রাসের রাজত্বের কারণে কোটি কোটি টাকার মুক্তিপণ বাণিজ্যে জিম্মি স্থানীয় বাসিন্দারা। টেকনাফ সীমান্ত ও মেরিন ড্রাইভের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে এখন সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী অপহরণ আতঙ্ক। এর মূল হোতা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন গহিন পাহাড়ে সক্রিয় থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও ডাকাত দল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও নজরদারিতে থামছে না তাদের অপরাধ কর্মকা-।

সংশ্লিষ্টদের মতে, টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলকে আস্তানা বানিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ। ভারী ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত এ অপরাধীরা মূলত স্থানীয় পাহাড়ি চাষি, লবণ শ্রমিক, অটোরিকশাচালক ও কাঠুয়ারিদের টার্গেট করে। অপহৃতদের পাহাড়ে জিম্মি করে পরিবারের কাছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়; টাকা দিতে দেরি হলে বা

অস্বীকৃতি জানালে নেমে আসে লোমহর্ষক নির্যাতন।

অপহরণের পর বেঁচে ফেরা হোয়াইক্যংয়ের কৃষক আমিন বলেন, ‘পাহাড়ের ভেতরে ওদের ‘টর্চার সেল’ আছে। চোখ বেঁধে লাঠি ও লোহার রড দিয়ে মারধর করে আর কান্নাকাটির শব্দ পরিবারকে ফোনে শোনায়। টাকা দিতে না পারলে কুপিয়ে বা গুলি করে হত্যা করে লাশ গহিন জঙ্গলে ফেলে দেয়। আমরা এখন নিজেদের জমিতে চাষ করতে যেতেও ভয় পাচ্ছি।’

জনপ্রতিনিধিদের উদ্বেগ : টেকনাফের বাহারছড়া ইউপি সদস্য ফরিদুল্লাহ ও হোয়াইক্যং ইউপির জনপ্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, পাহাড়ে রোহিঙ্গা অপরাধীদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু অপরাধী ও দালাল চক্রের যোগসাজশ রয়েছে। এই দালালরাই মূলত স্থানীয়দের গতিবিধির তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে সরবরাহ করে। দিন দিন তাদের অস্ত্রের মহড়া ও নৃশংসতা এতটাই বাড়ছে যে, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরো সীমান্ত ও পাহাড়ি অঞ্চলে চিরুনি অভিযান ছাড়া এই বিষফোঁড়া নির্মূল করা সম্ভব নয়।

টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা জাফর জানান, কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের কারণে সাধারণ রোহিঙ্গারাও ক্যাম্পের ভেতরে জিম্মি ও কলঙ্কিত হচ্ছে। মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আধিপত্য বিস্তার করতেই এই চক্রগুলো অপহরণকে আয়ের অন্যতম উৎস বানিয়েছে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সম্ভব।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় ড্রোন ও পুলিশের চৌকস টিম নিয়ে  নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাচ্ছি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শীর্ষ অপহরণকারীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার এবং বহু অপহৃত ভুক্তভোগীকে জীবিত উদ্ধার করেছি। তিনি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, অনেকে অপরাধীদের ভয়ে পুলিশকে না জানিয়ে গোপনে মুক্তিপণ দিয়ে দেয়, যা এই চক্রগুলোকে আরও বেশি উৎসাহিত করে। অপহরণ সিন্ডিকেট নির্মূলে তাদের বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।