উল্টোটা মনে হতে পারে, কিন্তু সত্যিটা হলো, হুয়ান রুলফোর রচনার তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে খুব কম মানুষই তার সেই গভীর ব্যক্তিগত সাহিত্যজগতে কঠোর, শীতল ও স্বতন্ত্র নর্ডিক সাহিত্যের বিরাট প্রভাবকে প্রয়োজনীয় সূক্ষ্মতা দিয়ে শনাক্ত করতে পারেন। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই সাহিত্যজগতের বিশ্বজনীন হয়ে ওঠা ছিল যেন অনিবার্য, অভিঘাতও ছিল প্রবল।
এই বিশাল ও বিস্তর বিষয়টিকে যথার্থরূপে ব্যাখ্যা করা দুঃসাধ্য কাজ—তা স্বীকার করেই বলি, এমন বহু লেখা আছে যেখানে রুলফোর সেই কিংবদন্তিতুল্য ছবিটিকেও পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে—তিনি নাকি অনায়াসে জার্মান থেকে স্প্যানিশে অনুবাদ করতেন। সেই ধারণা থেকেই অনেকে বলেন, নর্ডিক সাহিত্য ও সেই সংস্কৃতির প্রতি তার আকর্ষণ থাকায় এ যেন তার জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে।
আমি বিশ্বাস করতে চাই, সন্দেহ, ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং বাস্তবের বদলে ভুতুড়ে উপস্থিতির মতো উপাদানে ভরা সেই সাহিত্যিক জগৎ, তার সঙ্গে ভূখণ্ডের গুরুত্ব, কথ্যভাষার অনন্য লিখিত পুনর্নির্মাণ আর কঠিন, অনুর্বর ও রুক্ষ ভূদৃশ্যই ছিল সেই শক্তিশালী চুম্বক, যা বাংলাদেশি অনুবাদক ও লেখক আনিসুজ জামানকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল হালিস্কো নামের সেই কিংবদন্তির ভূখণ্ডে। সেখান থেকেই তিনি সম্পন্ন করেছিলেন সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে দক্ষ অনুবাদটি—নিজেরই অনুবাদ।
প্রিন্সেসা নেগ্রা দে দোশ এস্তামব্রেস (Ediciones del Lirio, ২০২৪) শুধু আনিসুজ জামানের কল্পনার ফসল নয়; এটি সেই অভিধানগুলোরও ফল আর রুলফোর সেই বইগুলোরও, যাদের সঙ্গে তিনি প্রতিদিন বাস করেন। এটি এমন এক রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা প্রায় ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির সীমানায় পৌঁছে যায়।
প্রিন্সেসা নেগ্রা দে দোশ এস্তামব্রেস (Ediciones del Lirio, ২০২৪) শুধু আনিসুজ জামানের কল্পনার ফসল নয়; এটি সেই অভিধানগুলোরও ফল আর রুলফোর সেই বইগুলোরও, যাদের সঙ্গে তিনি প্রতিদিন বাস করেন। এটি এমন এক রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা প্রায় ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির সীমানায় পৌঁছে যায়।
তাই বিস্ময়ের কিছু নেই যে, অভিবাসনের জটিল বহুমাত্রিক জগৎকে—নির্বাসন, স্থানান্তর, অনুবাদ, পথ, সেতু, নতুন অস্তিত্ব—উপাদান হিসেবে নিয়ে আনিসুজ জামান আমাদের সামনে এমন এক ধারণা হাজির করেন, যাকে আমি বলি ‘অন্তরঙ্গ অনুবাদের প্রকল্প’।
অনেক সাধারণীকরণ-প্রবণ সমালোচক যা বলেছেন, তার বিপরীতে প্রিন্সেসা নেগ্রা দে দোশ এস্তামব্রেস মোটেও এমন কোনো উপন্যাস নয়, যা শুধু মেক্সিকান বিপ্লবের কথা বলে বা সেটিকেই দেখায়। সত্যি বলতে, এর চেয়ে ভুল ধারণা আর হতে পারে না।
ধীরে ধীরে সিদ্ধ হওয়া অপূর্ব সব চিত্রকল্পের আড়ালে, এই প্রথম উপন্যাসজুড়ে আনিস আসলে যে কাজটি করে চলেছেন, তা হলো এমন এক রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা প্রায় ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির সীমানায় গিয়ে পৌঁছায়, কিন্তু সেখানেও থেমে থাকে না। বরং আরও দূরে চলে যায়—এমন এক অঞ্চলে, যেখানে মেক্সিকান পাঠক সত্যিই অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন। কারণ লেখক তাকে বাধ্য করেন এমন সব অবস্থানে দাঁড়াতে, এমন সব জুতোর ভেতর পা গলাতে, যা গভীরভাবে অস্বস্তিকর।
ধীরে ধীরে সিদ্ধ হওয়া অপূর্ব সব চিত্রকল্পের আড়ালে, এই প্রথম উপন্যাসজুড়ে আনিস আসলে যে কাজটি করে চলেছেন, তা হলো এমন এক রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা প্রায় ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির সীমানায় গিয়ে পৌঁছায়, কিন্তু সেখানেও থেমে থাকে না। বরং আরও দূরে চলে যায়—এমন এক অঞ্চলে, যেখানে মেক্সিকান পাঠক সত্যিই অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন। কারণ লেখক তাকে বাধ্য করেন এমন সব অবস্থানে দাঁড়াতে, এমন সব জুতোর ভেতর পা গলাতে, যা গভীরভাবে অস্বস্তিকর।
ঘনিষ্ঠতা হয়ে ওঠা কেমন অনুভূতি? অভিবাসী হয়ে ওঠা? একটি পাতা হয়ে ওঠা? নাকি এক অদ্ভুত, বহিরাগত ফুল?
তার নিজের ভাষা অনুযায়ী, এই উপন্যাসকে যদি কেবল একটি প্রেমের গল্প হিসেবে পড়া হয়, তবে তা খুবই উপরিতলেই পড়া হয়। এখানে তিনজন প্রধান চরিত্র আছে, তারা সবাই এক অস্থির প্রেমের ভেতরে ডুবে আছে, অথচ কোথাও কোনো প্রেমের ত্রিভুজ গড়ে ওঠে না। আর ঠিক সেখানেই, সব প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দিয়ে, মেক্সিকান সমাজের দ্বিমুখী নৈতিকতার ওপর প্রথম আঘাতটি আসে। গল্পটি তখন পাঠককে তাঁতির ভূমিকায় বসায়, যাতে আমরা ধীরে ধীরে এমন সব পরিসর ও আবহে প্রবেশ করি, যেখানে বুননের সুচ একের পর এক আঁকতে থাকে সম্পূর্ণ অচেনা, বিস্ময়কর নকশা।
রচনশৈলীতে রুলফোর ভাষা ও ভঙ্গির ব্যবহার আনিসুজ জামান এতটাই স্পষ্টভাবে করেছেন যে, তিনি যেন উচ্চস্বরে জানিয়ে দেন—হ্যাঁ, হালিস্কোর সেই কিংবদন্তি লেখক উপন্যাসজুড়ে উপস্থিত। তিনি এই যাত্রার প্রধান আলোকবর্তিকা। প্রায় একশ বছর আগের সেই গ্রামীণ মেক্সিকো, যা একজন বাংলাদেশি লেখকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই ছিল অচেনা, এমনকি কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্নও, সেই জগৎকে তিনি অতিক্রম করেছেন। নিজের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্প্যানিশে এমনভাবে সেই সময়কার মেক্সিকোর দৈনন্দিন জীবন লিখেছেন, যেন সে যুগেরই কোনো স্থানীয় ইতিহাস লেখক। কখনো তিনি ইতিহাসকার, কখনো গল্পকার। ফলে চাভেলা ভারগাসের সেই বহুল উদ্ধৃত কথাটি যেন এখানে নতুন অর্থ পায়—‘মেক্সিকানরা জন্মায় যেখানে জন্মাতে তাদের ইচ্ছা হয়।’ আর জামানের এই সাহসী, অন্তরঙ্গ অনুবাদ-প্রকল্পকে সামনে রেখে যেন আরেকটি বাক্যও সত্য হয়ে ওঠে—একজন লেখক চাইলে নিজের সত্তাকেও রূপান্তরিত করতে পারেন; অন্য এক অস্তিত্বে বাস করতে পারেন।
রচনশৈলীতে রুলফোর ভাষা ও ভঙ্গির ব্যবহার আনিসুজ জামান এতটাই স্পষ্টভাবে করেছেন যে, তিনি যেন উচ্চস্বরে জানিয়ে দেন—হ্যাঁ, হালিস্কোর সেই কিংবদন্তি লেখক উপন্যাসজুড়ে উপস্থিত। তিনি এই যাত্রার প্রধান আলোকবর্তিকা। প্রায় একশ বছর আগের সেই গ্রামীণ মেক্সিকো, যা একজন বাংলাদেশি লেখকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই ছিল অচেনা, এমনকি কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্নও, সেই জগৎকে তিনি অতিক্রম করেছেন। নিজের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্প্যানিশে এমনভাবে সেই সময়কার মেক্সিকোর দৈনন্দিন জীবন লিখেছেন, যেন সে যুগেরই কোনো স্থানীয় ইতিহাস লেখক। কখনো তিনি ইতিহাসকার, কখনো গল্পকার। ফলে চাভেলা ভারগাসের সেই বহুল উদ্ধৃত কথাটি যেন এখানে নতুন অর্থ পায়—‘মেক্সিকানরা জন্মায় যেখানে জন্মাতে তাদের ইচ্ছা হয়।’ আর জামানের এই সাহসী, অন্তরঙ্গ অনুবাদ-প্রকল্পকে সামনে রেখে যেন আরেকটি বাক্যও সত্য হয়ে ওঠে—একজন লেখক চাইলে নিজের সত্তাকেও রূপান্তরিত করতে পারেন; অন্য এক অস্তিত্বে বাস করতে পারেন।
রুলফোর প্রতীকগুলোর ভেতর দিয়ে নর্ডিক সাহিত্যপাঠ
রুলফো যেমন নর্ডিক সাহিত্যের সঙ্গে তার অদ্ভুত সম্পর্কের ভেতর দিয়ে পাঠকের প্রথম ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন, তেমনি আনিসও শুরুতে আমাদের এমন এক জগতে নিয়ে যান, যা দেখতে সাধারণ মেক্সিকান নারী-পুরুষের প্রেমের গল্প বলে মনে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আবরণ সরে যায়। সামনে আসে সংস্কৃতির মেলবন্ধন, অন্যের চোখে অন্য বাস্তবতাকে দেখার অভিজ্ঞতা, হতাশা, অবিচার, হাস্যরস, মৃত্যু—সবই এমন এক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা নিজের নয়। তিনি অপেক্ষা করেন, পাঠক যেন এই যাত্রার আহ্বান গ্রহণ করেন এবং পৃষ্ঠতলের নিচে নেমে যেতে রাজি হন।
হুয়ান রুলফো মুগ্ধ হয়েছিলেন হামসুনের চরিত্র ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহে, আর লাক্সনেসের শুষ্ক, কঠোর ও ট্রাজিক গদ্যে। অর্থাৎ হয়তো অজান্তেই আমরা রুলফোর প্রতীক, নীরবতা ও ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে নর্ডিক সাহিত্যও পড়ে এসেছি। তবে কি পরিচিত এক সাহিত্যিক মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মুখ?
বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক একটি ফুল—সাদা শাপলা। প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাসে এই ফুলের সঙ্গে মৃত্যু এবং পরজগতের সম্পর্ক ছিল। শাপলার একটি প্রজাতি আছে, যা জীবনের নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিজের লিঙ্গ এবং রঙ পরিবর্তন করতে পারে। যে ফুলে দুটি পুংকেশর থাকে তাকে বলা হয় ডায়ান্ড্রা। অর্থাৎ তার দুটি পুরুষ প্রজনন অঙ্গ রয়েছে।
আনিসুজ জামানও মুগ্ধ হয়েছিলেন এল সিয়েলো তেহিদো—হালিস্কোর এৎলাতলান শহরের সেই বোনা আকাশের প্রেমে। শহরের অসংখ্য নারী রঙিন উল দিয়ে কার্পেট তৈরি করেন, সেগুলো জোড়া লাগিয়ে ঝুলিয়ে দেন শহরের একেবারে মাঝখানে। সেই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আনিস শেষ পর্যন্ত রুলফোর সমগ্র ভুতুড়ে জগৎকে যেন নিজের চোখে দেখতে ও তার সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন।
লিব্রাদো, ‘এল মারিয়াচি’ আর মারিয়া কোনো প্রেমের ত্রিভুজ নয়। তারা অনুবাদের কুয়াশা থেকে জন্ম নেওয়া এক ভিন্ন বাস্তবতা। লিব্রাদো আর ‘এল মারিয়াচি’—এই দুজনেই মারিয়ার দুটি পুংকেশর। কিন্তু আমরা তা অস্বীকার করি। জানতে চাই না। দেখতে চাই না।
আর সেই ডায়্যান্ড্রার, সেই রাজকুমারীর গল্পই শেষ পর্যন্ত আমাদের ভেতরে প্রবেশ করবে—আমরা তা চাই বা না চাই।
● অনুবাদ : বোদরুল হেকীম