মানুষ বিপদে পড়লে তার অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন দুনিয়ার অনেক আশ্রয়ই অর্থহীন মনে হয়। মানুষ ফিরে আসে তার প্রকৃত আশ্রয়ের কাছে। হাত ওঠে দোয়ার জন্য। চোখ ভিজে যায় কান্নায়। হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসে আল্লাহর নাম। কিন্তু বিপদ কেটে গেলে মানুষের চিত্র অনেক সময় বদলে যায়। নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে অলসতা চলে আসে। জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যায় সেই রবের স্মরণ, যিনি বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন।
পবিত্র কোরআনে মানুষের এই দুর্বলতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষকে যখন বিপদ স্পর্শ করে তখন তারা তাদের প্রতিপালককে ডাকে তার অভিমুখী হয়ে। অতঃপর তিনি যখন তাদের নিজ অনুগ্রহ আস্বাদন করান তখন তাদের একদল তাদের প্রতিপালকের অংশীদার সাব্যস্ত করে বসে।’ (সুরা রুম ৩৩)
আয়াতটি মানুষের অন্তরের একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে। বিপদ মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর স্বস্তি অনেক সময় তাকে গাফেল করে দেয়।
বিপদের সময় মানুষ বুঝতে পারে, তার প্রকৃত ক্ষমতা কত সীমিত। অর্থ, সম্পদ, পরিচিতি কিংবা মানুষের সহযোগিতা সবকিছু থাকা সত্ত্বেও কিছু পরিস্থিতিতে মানুষ সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ে। তখন সে বুঝতে পারে, তার প্রয়োজন এমন একজনের কাছে, যিনি সবকিছুর মালিক।
সুস্থতার সময় আমরা অনেক কিছু সহজভাবে গ্রহণ করি। কিন্তু অসুস্থ হলে সুস্থতার মূল্য বুঝি। নিরাপদ থাকলে নিরাপত্তার কথা মনে থাকে না। বিপদ এলে নিরাপত্তার গুরুত্ব উপলব্ধি করি। অথচ যে আল্লাহ বিপদ দূর করে আবার স্বস্তি ফিরিয়ে দেন, তাকেই অনেক সময় ভুলে যাই।
এখানেই মানুষের জন্য বড় পরীক্ষা। বিপদ শুধু পরীক্ষা নয়। বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়াও পরীক্ষা। কষ্টের সময় ধৈর্য ধরতে হয়। আর স্বস্তির সময় কৃতজ্ঞ হতে হয়। একজন মুমিনের জীবন এই দুই অবস্থার মধ্যেই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম ৭)
তাই বিপদ কেটে গেলে মানুষের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। যে বিপদ থেকে তিনি মুক্ত করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া। যে ভয় দূর করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া। যে স্বস্তি দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া।
শুকরিয়া শুধু মুখের একটি শব্দ নয়। এর সঙ্গে জীবনের পরিবর্তনও জরুরি। নামাজ ঠিক করতে হবে। আল্লাহর স্মরণ বাড়াতে হবে। গুনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। মানুষের হক আদায় করতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত তার অবাধ্যতায় ব্যবহার করা যাবে না।
বিপদের সময় করা দোয়াগুলোও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। বরং বিপদ কেটে যাওয়ার পর আরও বেশি দোয়া করা উচিত। কারণ আল্লাহ শুধু বিপদের সময়ের রব নন। তিনি স্বস্তির সময়েও আমাদের রব। তিনি কষ্টের সময় আমাদের আশ্রয় দেন। আবার সুখের সময়ও তার নেয়ামতেই আমরা বেঁচে থাকি।
লেখক : ইসলামি গবেষক