প্রতিরোধে জরুরি প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপন্থা

অতীতে টাকার বিনিময়ে সশরীরে কিংবা অনলাইনে জুয়া খেলা বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত হতো, কিন্তু বর্তমানে এটি একটি সুসংগঠিত আর্থিক অপরাধে পরিণত হয়েছে। অনলাইনের কল্যাণে বিদেশি বেটিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জুয়া খেলা আমাদের জন্য সহজ হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের ভেতরে-বাইরে লেনদেন হচ্ছে। লেনদেনের এই অর্থের একটি বড় অংশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সরকার ১৮৬৭ সালে প্রণীত পাবলিক  গ্যাম্বলিং  অ্যাক্ট, ১৮৬৭ রহিত করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ জারি করে। তবে কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগের জন্য একটি সমন্বিত প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপন্থা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এক সময় আমরা লেনদেনে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করতাম। এই পণ্য বিনিময় প্রক্রিয়ায় অনেক অসুবিধা আছে, কারণ সবসময় এ রকম মিল পাওয়া যায় না। তাই চালু হলো ধাতব মুদ্রার মাধ্যমে পণ্য বিনিময়। পণ্য বিনিময় সহজ হয়ে গেল, সবাই মুদ্রার মাধ্যমে কেনাবেচা শুরু করলেন। কিন্তু এখানেও আরেকটি সমস্যা তৈরি হলো ধাতব মুদ্রাবাজারে বহন করে নিতে কষ্ট হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য রাষ্ট্র এগিয়ে এলো। রাষ্ট্রের কাছে সব ধাতব মুদ্রা জমা থাকবে, রাষ্ট্র নাগরিককে একটা সনদ বা সার্টিফিকেট সরবরাহ করবে, ওই সনদে বলা আছে : চাহিদা মাত্র তোমার হাতে মুদ্রা দিতে বাধ্য থাকব। তুমি নিশ্চিন্তে এটিকে ধাতব মুদ্রা মনে করে কেনাকাটা করতে পারো,  যার কাছে এই সনদ থাকবে আমি তাকেই ধাতব মুদ্রা দেব। এবার কেনাকাটা আরও সহজ হয়ে গেল। নাগরিক শুধু পকেটে ওই সনদ নিয়ে ঘুরে বেড়াত, ওই সনদ হস্তান্তর করে পণ্য বিনিময় করা শুরু করে। ওই সনদই আজকের কাগজের মুদ্রা বা নোট, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টাকা। এজন্যই দেখবেন টাকার গায়ে লেখা থাকে ‘চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকবো’।

নতুন করে প্রশ্ন জন্ম নিল, আধুনিক ডিজিটাল যুগে কাগজের নোট ব্যবহার করব কেন? এরপর আপনাকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাগজের নোটের বদলে পয়েন্ট মানে স্কোর বিতরণ করলাম। আপনি লগইন করলেন আপনার কত পয়েন্ট আছে দেখলেন, মানে আপনি তত টাকার মালিক। ঠিক যেমন বিকাশ, নগদ অ্যাপে লগইন করলে আপনার পয়েন্ট দেখতে পান। ঐটাই আপনার টাকা, ঐটাই দেখিয়ে যেকোনো জায়গায় কর্র্তৃপক্ষের কাছে আপনি দাবি করলেই আপনাকে কাগজের নোট, আর নোট দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আপনি মুদ্রা চাইতে পারবেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা দিতে বাধ্য থাকবে। তাহলে কি দাঁড়াল আপনার অ্যাপে আপনার যে পয়েন্ট আছে সেই পয়েন্টটি আসলে মুদ্রার সনদ। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাপ্লিকেশন যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি ব্যবহার করি এবং যেকোনো লেনদেনে এমএফএস দিয়েই পরিশোধ করি, এমন কি আপনি যে বেতন পান সেটাও এই এমএফএস অ্যাপে আসে। এর সঙ্গে যদি ব্যাংকগুলোকে যুক্ত করে অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে লেনদেন করি তাহলে আমাদের কোনো নগদ টাকার প্রয়োজনই নেই। এটাই ডিজিটাল লেনদেন আর অ্যাপের ওই  পয়েন্টগুলোকে বলি ডিজিটাল মুদ্রা। ডিজিটাল লেনদেনের জন্য সব অবকাঠামো যদি নাগরিকদের জন্য তৈরি করা থাকে অর্থাৎ নাগরিকের লেনদেনের জন্য সব রকমের অবকাঠামো যদি সহজলভ্য থাকে তাহলে আমরা বলতে পারি ডিজিটাল লেনদেনের ইকো-সিস্টেম পরিপূর্ণ হয়েছে। এই ইকো সিস্টেম আমাদের দেশে তৈরি হতে অল্প কিছু বাকি আছে। তার মধ্যে অন্যতম সবার জন্য বিদ্যুৎ এবং ‘জিরো ডিজিটাল ডিভাইড’।

বিষয়টা যেহেতু অর্থ লেনদেনের ব্যাপার, খুবই স্পর্শকাতর। কাজেই লেনদেনের বিষয়টি খুবই নিরাপত্তা সহকারে সম্পন্ন করতে হবে। আরও উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এই নিরাপত্তা দেওয়া হলে আমরা এই ডিজিটাল মুদ্রাকে বলি ক্রিপ্টোকারেন্সি। এগুলো কেবল অর্থ আদান-প্রদানেই সীমাবদ্ধ। আমাদের এসব এমএফএস সরকারের কাছে নিবন্ধনকৃত এবং সরকারকে নির্দিষ্ট নিয়মে ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রদান করে। তাদের লেনদেনের লাভের অংশটুকু অর্থাৎ কমিশনের অংশটুকুর একটা বড় অংশ পায় ক্ষুদ্র এজেন্টরা, এমএফএস কর্র্তৃপক্ষ এবং অল্প কিছু অংশ সরকার পায় ভ্যাট, ট্যাক্স আকারে। লেনদেনের জন্য আমাদের এমএফএস কোম্পানিগুলো যে রকম অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে, বেশ কয়েকটি অসাধুচক্র প্রায় একই স্ট্রাকচারের অ্যাপ্লিকেশন সরকারের অনুমতি না নিয়েই গোপনে ব্যবহার করে। এই ব্যবহারকারীরা সংখ্যায় কম বলে এবং রাষ্ট্র ও সমাজে তাদের স্বীকৃতি নেই বলে তারা প্রাত্যহিক জীবনের লেনদেনে তা ব্যবহার করতে পারে না। তাদের সংখ্যা ছোট হলেও তারা তাদের একটা কমিউনিটি গড়ে তুলেছে এবং দিনে দিনে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই কমিউনিটিতে তারা লেনদেন বাড়ানোর জন্য অনলাইনে বিভিন্ন গেমের মাধ্যমে জুয়ার প্রচলন করেছে। জুয়ায় হার-জিত আছে, কাজেই হেরে যাওয়া ব্যক্তি জিতে যাওয়া ব্যক্তিকে পয়েন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করে। প্রত্যেকটা পয়েন্টের একটা মূল্য আছে। জুয়া খেলায় পয়েন্ট পরিশোধের জন্য পয়েন্ট কিনতে হয় আবার বেশি পয়েন্ট জমে গেলে তা বিক্রি করারও প্রয়োজন পড়ে। এই কাজে সহায়তার জন্য মাফিয়ার মতো কিছু এজেন্ট তৈরি হয়েছে যারা টাকার বিনিময়ে পয়েন্ট বিক্রি করেন, আবার কিনেও নেয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই এজেন্টরা পয়েন্ট ক্রয়-বিক্রয়ে ১%-এর মতো লাভ করে থাকেন। ক্রয়-বিক্রয়ে টাকা লেনদেনের এই বিষয়টি তারা আমাদের প্রচলিত এমএফএস কোম্পানিগুলো এবং ব্যাংকের ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকে। কিন্তু অনলাইন জুয়ায় এসব ট্রানজেকশনের জন্য সরকার কোনো রকমের ভ্যাট ট্যাক্স পায় না। উপরন্তু জুয়া খেলায় অনেক নাগরিক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেকেই সর্বস্বান্ত হচ্ছে। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে চুপ করে বসে থাকতে পারে না, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধকল্পে এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

অনলাইন জুয়ার অর্থপ্রবাহ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। অধিকাংশ অনলাইন জুয়া চক্র নিজেদের নামের হিসাব ব্যবহার করে না, বরং ভাড়া করা বা অন্যের পরিচয়ে খোলা একাধিক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে। ফলে প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন যেমন অল্প সময়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র অঙ্কের টাকা জমা হওয়া, একই হিসাব থেকে দ্রুত বিভিন্ন হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, কিংবা একই সময়ে বহু ব্যক্তির কাছ থেকে একই ধরনের অর্থপ্রাপ্তি ইত্যাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) লেনদেন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি যুক্ত করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সন্দেহজনক লেনদেন এবং তাদের নেটওয়ার্ক চক্রকে শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও এমন প্রযুক্তি চালু করা গেলে একই ডিভাইস, একই আইপি ঠিকানা, একই জাতীয় পরিচয়পত্র বা একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে পরিচালিত একাধিক হিসাব সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো অপরাধ চক্রকে চিহ্নিত ও আইনের আওতায় আনা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বাধ্যতামূলক জুয়া-ঝুঁকি সূচক প্রণয়ন করা যেতে পারে। বর্তমানে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে যেভাবে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা হয়, একই ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব।

তবে শুধু আইন বা প্রযুক্তি দিয়ে সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি মহলকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে, বাড়াতে হবে নজরদারি। এখনো অনেক মানুষ জানেন না যে, অনলাইন জুয়া বাংলাদেশের আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এ বিষয়ে শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। সবশেষে বলা যায়, অনলাইন জুয়া কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান বা গ্রেপ্তারই এর স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, প্রমাণভিত্তিক এবং সমন্বিত একটি জাতীয় কৌশল, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ তদন্ত, আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে। জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে অনলাইন জুয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং এই অপরাধের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

লেখক : প্রযুক্তিবিদ ও অধ্যাপক, আইআইটি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

patwary@juniv.edu