সরকারের ছয় মাস

আত্মতৃপ্তি নয়, আত্মজিজ্ঞাসা জারি থাকুক

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল পেরিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট শুধু সময়ের পরিক্রমাই নয়, এই সময়জুড়ে দেশ নিপতিত ছিল ক্রান্তিকালে। জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন বর্তমান সরকারের আজ ৬ মাস পূর্তিতে হিসাব-নিকাশের খেরোখাতা সামনে এসেছে। যেকোনো সরকারের শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ৬ মাস যথেষ্ট সময় নয় বটে, তবে সরকার এবং জনপরিসরে এ নিয়ে আলোচনা সংগত কারণেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমরা জানি, এই সরকার বহুবিধ জটিলতা সামনে রেখে দেশের শাসনভার কাঁধে তুলে নেয়। অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি ঘাটতি, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ প্রশাসনিক অবিন্যস্ত পরিস্থিতির মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সুরাহা কঠিন ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভার নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক কর্মপরিকল্পনা করা হয়। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ১৮০ দিনের রোডম্যাপ নির্ধারণ করা হয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার, জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং জরুরি নাগরিকসেবার মান নিশ্চিত করা।

আমরা জানি, পতিত রাজনৈতিক সরকারের তৈরি ক্ষত ও জনপ্রত্যাশা পূরণে আশানুরূপ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ অন্তর্বর্তী সরকারের সৃষ্ট আরও কিছু জঞ্জাল মোকাবিলা করে বিএনপির জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার পথ মসৃণ করার কাজটি সহজসাধ্য ছিল না। এর মধ্যে যুদ্ধ-সংঘাতে টালমাটাল বিশ্বে জ্বালানি সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠে এবং এর বাইরে থাকার আমাদেরও উপায় ছিল না। তারপরও সরকারের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল বলে আমরা মনে করি না। ওই সংকটের অভিঘাত বহুমুখী হয়ে উঠে এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নাজুক হয়ে ওঠার পাশাপাশি আরও কিছু উপসর্গ জনজীবনে বিড়ম্বনার পারদ ঊর্ধ্বমুখী করে। দফায় দফায় অভিযান চালিয়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায়নি। এ নিয়ে উৎকণ্ঠা-জিজ্ঞাসা বিদ্যমান। শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত-সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতার অপছায়া, ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের তথৈবচ অবস্থা শুধু যে জন উদ্বেগেরই কারণ হয়ে জিইয়ে আছে তা-ই নয়, সরকারের ভেতরেও এসব নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা এবং আত্মজিজ্ঞাসামূলক মনোভাবের সাধুবাদ জানাই।

আমরা মনে করি, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক আত্মজিজ্ঞাসাবোধ জাগ্রত থাকা খুব জরুরি। আত্মজিজ্ঞাসা আত্মতৃপ্তিতে নিমজ্জিত না রেখে নিজের ভেতরটা খতিয়ে দেখতে সজাগ রাখে। আত্মজিজ্ঞাসায় নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার পথ উন্মুক্ত হয় এবং কার্য পরিচালনা ও লক্ষ্য ঠিক করাও হয় সহজ। আমরা এও মনে করি, গঠনমূলক সমালোচনা উদারচিত্তে আমলে নেওয়া দরকার। সরকার পরিচালনার জন্য প্রধানত সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের কল্যাণ এই তিনটি লক্ষ্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমলে রাখা উচিত। সরকারি সব স্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি পুষ্ট করা জরুরি। দুর্নীতি নির্মূলে অঙ্গীকারই শেষ কথা নয়, থাকতে হবে অনমনীয়ও। বেকারত্ব দূরীকরণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে যে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান এর নিরসনে চাই দূরদর্শী পরিকল্পনা। দেশকে মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সর্বজনীন সুরক্ষা কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, নারীদের শিক্ষার পথ সুগম করাসহ বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সবুজ অর্থনীতি ও নার্সারি উদ্যোগ, শ্রম সংস্কার ও ন্যায্য মজুরি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়নসহ সামাজিক সুরক্ষা বলয় সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সরকারকে জনবান্ধব এসব উদোগের জন্যও সাধুবাদ জানাই। কিন্তু একই সঙ্গে এও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, কৃষক, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোয় যাতে কদাচার-অনাচারের আঁচড় না লাগে এ ব্যাপারে সজাগ-সতর্ক থাকার বিকল্প নেই। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবায়নে সরকার থাকুক অটল। নীতির স্বচ্ছতা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় ঝড় যত তীব্রই হোক, শিকড় শক্ত হলে গাছ উপড়ে যায় না। এই উপমহাদেশের প্রাচীন অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা চাণক্য যথার্থই বলেছেন, ‘প্রজার সুখেই রাজার সুখ, প্রজার কল্যাণেই রাজার কল্যাণ’।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত