নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী কুসুম্বা মসজিদ

ধান, চাল ও মাছ উৎপাদনে বিখ্যাত নওগাঁ। এ জেলায় রয়েছে ৫২৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে এর অবস্থান। নাম কুসুম্বা মসজিদ। এই প্রাচীন মসজিদটি স্থাপত্যশৈলী, কারুকাজ ও ঐতিহাসিক গুরুত্বে অনন্য। পাঁচ টাকার নোটে ছাপা হয়েছে এর ছবি। ফলে দেশের মানুষের কাছে মসজিদটি আরও পরিচিত।

সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে ১৪৯৮ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে প্রাচীন বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এটি আয়তাকার। দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ ফুট এবং প্রস্থ ৪২ ফুট। দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু। ইটের তৈরি মূল কাঠামোর ওপর পাথরের আবরণ দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো মসজিদটি ধূসর ও কালো পাথরের সৌন্দর্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য পেয়েছে।

মসজিদের ছাদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। এগুলো দুই সারিতে নির্মিত। চার কোণে রয়েছে আটকোনাকৃতির বুরুজ। মসজিদের কার্নিশ সামান্য বাঁকানো। এই বৈশিষ্ট্য বাংলার প্রাচীন স্থাপত্যরীতির প্রভাবকে স্পষ্ট করে।

মসজিদের ভেতরের কারুকাজও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব। কালো পাথরে তৈরি এসব মিহরাবে খোদাই করা হয়েছে ফুল, লতাপাতা ও আঙ্গুরগুচ্ছের নকশা। পাথরের স্তম্ভ, মেঝে, ভিত্তিমঞ্চ এবং জালি নকশাতেও সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়। প্রতিটি অংশেই প্রাচীন কারিগরদের দক্ষতার ছাপ রয়েছে।

১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটির তিনটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর সেগুলো সংস্কার করে। সময়ের সঙ্গে মসজিদটির চারপাশেও উন্নয়ন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে মসজিদের আশপাশে ফুলের বাগান ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।

মসজিদের সামনে রয়েছে বিশাল কুসুম্বা দিঘি। প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের এই দিঘিটি স্থানীয় মানুষ ও মুসল্লিদের পানি, গোসল ও অজুর প্রয়োজন মেটায়। দিঘিটি মসজিদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদ ও দিঘিকে ঘিরে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।

স্থানীয় মুসল্লিরা এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার ও দুই ঈদের দিনে মসজিদ প্রাঙ্গণ মুসল্লিতে পূর্ণ হয়ে যায়। রমজান মাসে এখানে তারাবির নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে মসজিদটি দেখতে। কেউ আসে পাঁচ টাকার নোটে দেখা ছবির বাস্তব রূপ দেখতে। কেউ আসে প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। আবার অনেকেই আসে নামাজ আদায় ও ঐতিহাসিক স্থানটি ঘুরে দেখতে।

কুসুম্বা মসজিদ বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের মূল্যবান স্মারক। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে আজও দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। কুসুম্বা দিঘির শান্ত জল আর পাথরের ধূসর মসজিদ মিলে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য পরিবেশ। ইতিহাস, স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এই মিলনস্থল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও বাংলাদেশের গৌরবময় অতীতের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে থাকবে।

লেখক : ইসলামি গবেষক