ইমান বাড়ার লক্ষণ

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৩ এএম

ইমান মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়। সেই আলো মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজে প্রকাশ পায়। ইমান যত শক্তিশালী হয়, মানুষের জীবনেও তত পরিবর্তন আসে। মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বাড়ে। গুনাহের প্রতি ভয় তৈরি হয়। নেক কাজের প্রতি আগ্রহ জন্মে। দুনিয়ার মোহ কমে যায়। আখেরাতের চিন্তা গভীর হয়। ইমান বাড়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ উল্লেখ করা হলো।

আল্লাহর নাম শুনলে : ইমান বৃদ্ধির অন্যতম লক্ষণ হলো আল্লাহর প্রতি অন্তরের অনুভূতি গভীর হওয়া। আল্লাহর নাম শুনলে হৃদয়ে তার মহত্ত্বের অনুভূতি জাগে। তার ভয় ও ভালোবাসা তৈরি হয়। নিজের ভুল-ত্রুটি মনে পড়ে। অন্তর সংশোধনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ইমানদার তো তারা, যাদের অন্তরগুলো কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়।’ (সুরা আনফাল ২)

এটি এমন ভয় নয়, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বরং এটি এমন ভয়, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। মুমিন জানে, আল্লাহ তাকে দেখছেন। তাই সে প্রকাশ্যে যেমন গুনাহ থেকে বাঁচে, গোপনেও তেমন সতর্ক থাকে।

কোরআন তেলাওয়াত শুনলে : কোরআন তেলাওয়াত শুনলে ইমান বাড়ে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যখন তাদের কাছে তার আয়াতগুলো পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল ২)

নামাজের প্রতি ভালোবাসা বাড়া : ইমান বাড়লে নামাজের গুরুত্ব মানুষের কাছে আরও স্পষ্ট হয়। নামাজ তখন শুধু দায়িত্ব থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মুমিন নামাজকে বোঝা মনে করে না। বরং নামাজের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি খোঁজে। ব্যস্ততার মধ্যেও নামাজের সময়কে গুরুত্ব দেয়। নামাজে মনোযোগ আনার চেষ্টা করে। সুরা আনফালের ৩ নম্বর আয়াতে নামাজ আদায়কে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে।

আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বৃদ্ধি পাওয়া : ইমান শক্তিশালী হলে মানুষের ভরসার কেন্দ্র বদলে যায়। সে চেষ্টা করে। উপায় অবলম্বন করে। কিন্তু ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করে। বিপদ এলে সে ভেঙে পড়ে না। কারণ সে জানে, তার রব তার অবস্থা জানেন। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুই ঘটে না। তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং নিজের দায়িত্ব পালন করে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

গুনাহের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া : ইমান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুনাহের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। আগে যে কাজকে সামান্য মনে হতো, পরে সেটিই তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। গুনাহ হয়ে গেলে সে আনন্দিত থাকে না। অন্তরে অনুশোচনা জন্ম নেয়। দ্রুত তওবা করার চেষ্টা করে। এ অনুশোচনাও ইমান জীবন্ত থাকার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

নেক আমলের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া : ইমান হৃদয়ে শক্ত হলে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। নামাজ, রোজা, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত, সদকা ও মানুষের উপকার করার প্রতি মন টানে। নেক কাজ করার সুযোগকে তখন মানুষ সৌভাগ্য মনে করে। ভালো কাজ শেষ করে প্রশংসা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রধান লক্ষ্য বানায়।

মানুষের প্রতি দয়া বৃদ্ধি পাওয়া : ইমান শুধু ইবাদতের জায়গায় পরিবর্তন আনে না। মানুষের সঙ্গে আচরণেও এর প্রভাব পড়ে। ইমান বাড়লে হৃদয় কোমল হয়। মানুষ অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখে। অসহায়কে সাহায্য করে। ভুল হলে ক্ষমা করে। নিজের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি অন্যের অধিকার নিয়েও চিন্তা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহিহ বুখারি)

বিপদে ধৈর্য ও সুখে কৃতজ্ঞতা : ইমানের শক্তি বিপদের সময় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুমিন বিপদে কষ্ট পায়। দুঃখ অনুভব করে। কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। সে ধৈর্য ধরে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। নিজের অবস্থাকে আল্লাহর হেকমতের ওপর ছেড়ে দেয়। অন্যদিকে সুখ ও সমৃদ্ধি এলে সে অহংকারী হয় না। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। কারণ সে জানে, নেয়ামতের প্রকৃত দাতা আল্লাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার সব অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ পেলে সে শুকরিয়া আদায় করে। তা তার জন্য কল্যাণকর। আর বিপদে পড়লে সে ধৈর্য ধারণ করে। সেটিও তার জন্য কল্যাণকর। (সহিহ মুসলিম)

দুনিয়ার মোহ কমে যাওয়া : ইমান বাড়লে দুনিয়া মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে যায় না। তবে দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। সে দুনিয়াকে লক্ষ্য নয়, আখেরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। সম্পদ থাকবে, পরিবার থাকবে, কিন্তু এগুলোর কোনোটি আল্লাহর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না।

অহংকার কমে বিনয় বাড়া : ইমান মানুষের ভেতরের অহংকার ভেঙে দেয়। সে বুঝতে পারে, তার জ্ঞান সীমিত। তার শক্তি সীমিত। তার জীবনও আল্লাহর দান। তাই সে মানুষের প্রতি অহংকার করে না। নিজের আমল নিয়েও আত্মতুষ্টিতে ভোগে না।

আখেরাতের চিন্তা বৃদ্ধি পাওয়া : ইমানদার মানুষের কাছে মৃত্যু জীবনের শেষ নয়। এটি আখেরাতের পথে যাত্রার শুরু। তাই ইমান বাড়লে আখেরাতের চিন্তা বাড়ে। হিসাবের কথা মনে পড়ে। জান্নাতের আশা জাগে। জাহান্নামের ভয় তৈরি হয়। এই চিন্তা তাকে হতাশ করে না। বরং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত