রবিউল আউয়াল মাস ও নবীপ্রেম

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৭ এএম

সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন। এ মাস এলেই মুসলিম সমাজে নতুন করে নবীপ্রেম জাগ্রত হয়। শুরু হয় নবীজি (সা.)-এর জীবনী চর্চা। তবে নবীপ্রেম এবং নবীজি (সা.)-এর জীবনী চর্চা সারা বছর অব্যাহত রাখা জরুরি। তবেই তার জীবন, চরিত্র, আদর্শ, নৈতিকতা এবং তার সুন্নাহ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল।’ (সুরা আলে ইমরান ১৬৪) এই আয়াতে মহানবী (সা.)-এর আগমনকে মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন মক্কার সম্মানিত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে। তিনি জন্মের পূর্বেই তার পিতা ইন্তেকাল করেন। শৈশবে মাকে হারান। এতিম হলেও তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। পরে দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং তার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব স্নেহ ও দায়িত্বের সঙ্গে তাকে লালন-পালন করেন।

মহান আল্লাহ তার সেই জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পথ না জানা অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন। তিনি আপনাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর সমৃদ্ধ করেছেন।’ (সুরা দোহা ৬-৮)

সিরাতের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। যখন তাকে সোমবারে রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন, এ দিনেই আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনেই আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

এই হাদিস থেকে জন্মদিন উপলক্ষে তার নিজস্ব শিক্ষা স্পষ্ট হয়। তিনি কোনো উৎসবের নির্দেশ দেননি। বরং আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে রোজা রেখেছেন।

শৈশবে তিনি বনু সাদ গোত্রে হালিমা সাদিয়ার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। আরবদের মধ্যে বিশুদ্ধ ভাষা, সুস্থ পরিবেশ এবং দৃঢ় চরিত্র গঠনের জন্য শিশুদের মরুভূমির পরিবেশে প্রতিপালনের একটি প্রথা ছিল। এই সময়েই তার স্বভাবের মধ্যে সত্যবাদিতা, সরলতা, ধৈর্য এবং আত্মমর্যাদাবোধের বীজ রোপিত হয়।

কৈশোরে তিনি মেষপালকের কাজ করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আল্লাহ যেসব নবী প্রেরণ করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই মেষ চরিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি ২২৬২)

যৌবনে তিনি বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। ব্যবসায়িক সফরে তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আমানতদারিতা এমনভাবে প্রকাশ পায় যে, সবাই তার চরিত্রের প্রতি আস্থা স্থাপন করে। প্রতারণা, মিথ্যা, ওজনে কম দেওয়া কিংবা অন্যায় লাভের কোনো দাগ তার জীবনে ছিল না। ফলে মক্কার সমাজ তাকে আল-আমিন তথা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করে। মহান আল্লাহ তার চারিত্রিক মহত্ত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম ৪)

তার চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হিলফুল ফুজুল গঠনে অংশগ্রহণ। মক্কার কিছু ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য একটি চুক্তি করেছিলেন। মহানবী (সা.) তাতে অংশগ্রহণ করেন। নবুয়ত লাভের পরও তিনি সেই চুক্তির প্রশংসা করে বলেন, যদি ইসলামের যুগেও এমন আহ্বান করা হতো, তবে তিনি তাতে সাড়া দিতেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম)

পঁচিশ বছর বয়সে তিনি সম্মানিত ব্যবসায়ী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-এর ব্যবসা পরিচালনা করেন। তার সততা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এই বিয়ে ছিল সত্য, বিশ্বস্ততা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক আদর্শ দাম্পত্য জীবনের সূচনা।

নবুয়তের পূর্বে তার আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা হলো হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের বিরোধ নিষ্পত্তি। কাবা পুনর্নির্মাণের সময় বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে কে পবিত্র পাথরটি স্থাপন করবে, এ নিয়ে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। তখন মহানবী (সা.) একটি চাদরের ওপর হাজরে আসওয়াদ রেখে সব গোত্রপ্রধানকে চাদরের কোনা ধরতে বলেন এবং নিজ হাতে পাথরটি যথাস্থানে স্থাপন করেন। এই প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।

রবিউল আউয়াল মাসের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নবীপ্রেমের প্রকৃত দাবি হলো, নবীজি (সা.)-এর চরিত্রকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ধারণ করা।

মক্কার সমাজ তখন নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত। মূর্তিপূজা, সামাজিক বৈষম্য, নারী নির্যাতন, সুদ, প্রতারণা এবং গোত্রবাদ মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এই বাস্তবতা মহানবী (সা.)-কে গভীরভাবে ব্যথিত করত। তিনি প্রায়ই মক্কার নিকটবর্তী জাবালে নুরের হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন, ধ্যান, চিন্তা ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন। তার এই নির্জন সাধনা ছিল মানবতার মুক্তির জন্য নীরব প্রস্তুতি।

চল্লিশ বছর বয়সে রমজান মাসের এক রাতে সেই মহান মুহূর্ত উপস্থিত হয়। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তার কাছে প্রথম ওহি নিয়ে আসেন। প্রথম ওহির অভিজ্ঞতায় তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত গৃহে ফিরে আসেন। তখন তার সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয় হয়ে দাঁড়ান সহধর্মিণী খাদিজা (রা.)।

খাদিজা (রা.) তাকে তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে নিয়ে যান। তিনি পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব সম্পর্কে জ্ঞানী ছিলেন। সবকিছু শুনে তিনি বলেন, ‘এ তো সেই মহান ফেরেশতা, যিনি মুসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। হায়! আমি যদি আপনার দাওয়াতের সময় জীবিত থাকতাম!’ (সহিহ বুখারি ৩)

নবুয়ত লাভের পর প্রথমে তিনি অত্যন্ত নিকটজনদের মধ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তার সহধর্মিণী খাদিজা (রা.), তারপর আলি (রা.), যায়েদ (রা.) এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। এই ক্ষুদ্র দলটিই পরবর্তী সময়ে বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এক মহাবিপ্লবের সূচনা করে। তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেওয়ার পর মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন।

এরপর তিনি সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের উদ্দেশে তাওহিদের আহ্বান জানান। কিন্তু সত্যের এই আহ্বান মক্কার নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ফলে শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। দুর্বল ও অসহায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়।

মক্কার নির্যাতন যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তিনি কিছু সাহাবিকে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। সেখানে খ্রিস্টান ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজ্জাশির আশ্রয়ে মুসলমানরা নিরাপদে বসবাস করতে সক্ষম হন। এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরত এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

এরপর কুরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। খাদ্যাভাব, দারিদ্র্য এবং বিচ্ছিন্নতার সেই সময় ছিল ইমানের কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু এই অবরোধও মহানবী (সা.)-কে তার মিশন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

মক্কার নেতারা যখন দেখল যে নির্যাতন ও বয়কটের মাধ্যমে ইসলামকে দমন করা সম্ভব নয়, তখন তারা মহানবী (সা.)-কে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সঙ্গে থাকেন আবু বকর (রা.)। পথে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মদিনায় পৌঁছান।

মদিনায় পৌঁছে তিনি মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা, বিচার, পরামর্শ, কূটনীতি, সামাজিক সহায়তা এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল এ মসজিদ। এরপর মক্কা বিজয়, বিদায় হজ এবং নবীজি (সা.)-এর ওফাত পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে নানা শিক্ষা রয়েছে মুসলমানদের জন্য। নবীজি (সা.)-এর জীবনী চর্চা করলে আমরা সবকিছু যথাযথভাবে জেনে তা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারব।

লেখক : সহ-সুপার, আল-ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা, পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত