রাশিয়ায় নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। গত শনিবার রাতে প্রায় ৯০০ ড্রোন দিয়ে চালানো এ হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। রুশ বার্তা সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এটি ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল রাশিয়ার বিভিন্ন সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা, তেল পরিশোধনাগার ও গুদাম। মস্কোসহ ১৭টি অঞ্চলে ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
মস্কোর গভর্নর আন্দ্রি ভোরোভিয়েভ জানিয়েছেন, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে ১৮৭টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মস্কোর কাছে রাশিয়ার বড় অনলাইন মার্কেটপ্লেস ওয়াইল্ডবেরিসের একটি গুদামেও ড্রোন আঘাত হানে বলে জানা গেছে। হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভে পাঁচজন এবং মস্কোয় ৮৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এর আগে শনিবার কিয়েভের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ফ্লেমিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার নতুন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থায় হামলা চালায়। সীমান্ত থেকে প্রায় ৫৬০ মাইল দূরের ওই কেন্দ্রে রাশিয়ার নতুন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থার উৎক্ষেপণ যান তৈরি করা হচ্ছিল। মস্কোর পরিকল্পনা ছিল, এই ‘রাসভেট’ স্যাটেলাইট দিয়ে ই-কমার্স ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট দূর করা।
পাল্টা জবাবে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় হতাহতসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল রবিবার কয়েক দফায় বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ইউক্রেনের একাধিক শহর। সকালের দিকে কিয়েভসহ আশপাশের আকাশে রাশিয়ার জেটচালিত ড্রোনের আনাগোনা দেখা যায়। হামলায় একটি বৃহৎ বইয়ের বাজারসহ একাধিক ভবনে আগুন ধরে যায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চেয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন।
কিয়েভের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধ রাখতে রাশিয়ার কাছে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইউক্রেন। অঞ্চলটিতে জাহাজ ও বন্দরে একের পর এক হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নিয়েছিল কিয়েভ। তবে ইউক্রেনের পাঠানো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। কারণ হিসেবে মস্কো বলেছে, রাশিয়া ‘আংশিক’ যুদ্ধবিরতিতে বিশ্বাস করে না। এছাড়া কৃষ্ণসাগরে সম্প্রতি রুশ জাহাজ লক্ষ্য করে ইউক্রেনের হামলাও এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অন্যতম কারণ বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা।
বিবৃতিতে কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের হামলাকে ‘নির্লজ্জ সন্ত্রাসী আক্রমণ’ উল্লেখ করে জাখারোভা বলেছেন, ‘সম্প্রতি কৃষ্ণসাগরে রুশ জাহাজ লক্ষ্য করে ইউক্রেন যেসব হামলা পরিচালনা করেছে, আমরা মনে করি সেসব ইউক্রেনের পূর্বপরিকল্পিত ছিল। হামলাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল কৃষ্ণসাগরে নৌচলাচলকে অস্থিতিশীল করে উত্তেজনা আরও বাড়ানো এবং সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করা। আর এই সব কিছুই ঘটছে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের নির্লজ্জ মৌন সম্মতিতে’।
রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ দুই কৃষিপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। সম্প্রতি এমন পণ্য রপ্তানিতে ব্যবহৃত জাহাজে হামলা বেড়ে গেছে। আর এসব হামলার জন্য দুই দেশই একে অপরকে দোষারোপ করেছে। রাশিয়ার হামলার আশঙ্কায় জুলাইয়ের শেষ দিকে অনেক জাহাজ মালিক ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের ওডেসার বন্দরগুলোতে জাহাজ পাঠানো বন্ধ করে দেন। ওডেসায় রাশিয়ার হামলায় বেশ কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মূলত তারা এই পদক্ষেপ নেন। ফলে বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে কিয়েভ।