বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় জয়

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়কে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। গতকাল মারারা স্টেডিয়ামে জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে দলীয় ঐক্য, পরিকল্পনা ও তিন বিভাগে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই এনে দিয়েছে এই অবিশ্বাস্য সাফল্য, যা বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশকে নতুন পরিচয় দিয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কীভাবে দেখছেন?

নাজমুল হোসেন শান্ত : আমার কাছে এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। তিন সংস্করণ মিলিয়ে বাংলাদেশের অনেক বড় অর্জন আছে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের মাটিতে এই জয় নিঃসন্দেহে বিশেষ। এর পেছনে দলের প্রত্যেক সদস্যের অনেক পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও আত্মত্যাগ ছিল। সবাই নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে বলেই আমরা এমন একটি ঐতিহাসিক ফল পেয়েছি।

এই ম্যাচের আগে কেমন পরিকল্পনা ছিল আপনাদের?

শান্ত : আমাদের পরিকল্পনা ছিল পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলা এবং প্রতিটি সেশনে নিজেদের সেরাটা দেওয়া। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই আমরা যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছি, সেটি সত্যিই গর্বের। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং তিন বিভাগেই আমরা ধারাবাহিক ছিলাম। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। চার দিনেই ম্যাচ শেষ হয়েছে, তবে প্রতিটি দিনই আমরা অত্যন্ত ভালো ক্রিকেট খেলেছি।

এমন ঐতিহাসিক জয়ের পর নিশ্চয় অনেক শুভেচ্ছাবার্তা পাচ্ছেন?

শান্ত : আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর (তারেক রহমান) সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আমাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থারও খোঁজ নিয়েছেন। আমাদের বোর্ড সভাপতি (তামিম ইকবাল) ফোন করে শুভেচ্ছা জানান এবং তিনি এই সাফল্যে খুবই খুশি। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই ফোন কলগুলো আমাদের জন্য বিশেষ ও আনন্দের ছিল। সবচেয়ে ভালো লাগছে, দেশের মানুষও আমাদের এই জয় উপভোগ করছেন। আমি মনে করি, এই সাফল্যে পুরো দেশই অনেক খুশি।

অনেকেই ভালো পারফর্ম করেছেন। আপনার চোখে সেরা কে?

শান্ত : আমার কাছে ম্যাচসেরা পুরো বাংলাদেশ দল। সবাই কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছে। তামিমের (তানজিদ হাসান) প্রথম সেঞ্চুরি তার জন্য বিশেষ অর্জন। মিরাজ (মেহেদী হাসান) ব্যাটিং ও বোলিং দুই জায়গাতেই অসাধারণ করেছে। সাদমানের (ইসলাম) প্রথম ইনিংসের ২০ রানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে বিশেষভাবে লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের কৃতিত্ব দিতে চাই। হাসান (মাহমুদ), তাইজুল (ইসলাম), তাসকিন (আহমেদ) ও এবাদত (হোসেন) যেভাবে ব্যাটিং করেছে, তা দলের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন আপনাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল, সেটা কাটালেন কীভাবে?

শান্ত : অবশ্যই কন্ডিশন কঠিন ছিল। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বমানের ব্যাটিং ও বোলিং আক্রমণের দল। তবে সিরিজের আগে আমরা নেতিবাচকভাবে চিন্তা না করে এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখেছি। এমন বোলিংয়ের বিপক্ষে কীভাবে রান করা যায়, আবার তাদের ব্যাটিংয়ের বিপক্ষে কীভাবে ভালো বোলিং করা যায়, সেটিই ছিল আমাদের ভাবনা। খেলোয়াড়রা চ্যালেঞ্জটি উপভোগ করেছে এবং কন্ডিশনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে।

প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যর্থতার পর এভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর বেশি কোনো কৌশল আছে?

শান্ত : প্রস্তুতি ম্যাচে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলিনি। তবে সেটি অনুশীলন ম্যাচ হওয়ায় খুব বেশি ভেঙে পড়ার কারণ ছিল না। ওই ম্যাচে কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় ঘাটতি ছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। সবাইকে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাই ম্যাচটি মূলত প্রস্তুতির অংশ ছিল। সেটির ফল এই টেস্টে আমাদের ওপর বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।

এই জয় কি বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে?

শান্ত : অবশ্যই। আমার মনে হয় আমরা বিশ্বক্রিকেটকে একটি ভালো বার্তা দিতে পেরেছি। বাংলাদেশ যেকোনো কন্ডিশনে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারে। এমন জয় ভবিষ্যতে আমাদের আরও বেশি সুযোগ এনে দিতে পারে। আমরা যদি নিয়মিত এ ধরনের কন্ডিশনে খেলার সুযোগ পাই, তাহলে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আরও বাড়বে। আশা করি, এই জয় ভবিষ্যতে আমাদের আরও কঠিন সিরিজ খেলার পথ তৈরি করবে।

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা নিয়ে এখন কতটা ভাবছেন?

শান্ত : পয়েন্ট টেবিল অনুযায়ী আমাদের সুযোগ আছে। তবে অধিনায়ক হিসেবে খুব দূরের চিন্তা করতে চাই না। সিরিজ কিংবা পরবর্তী ম্যাচ, এ মুহূর্তে সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা এখনো খুব অভিজ্ঞ টেস্ট দল নই, যদিও দলটি ধীরে ধীরে ভালো অবস্থানে যাচ্ছে। সুযোগ অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রতিটি ম্যাচে ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে।

এত বড় জয়েও আপনাকে বেশ শান্ত দেখাচ্ছে, কারণটা কী?

শান্ত : এটি আমার ব্যক্তিগত স্বভাব। আমি সবসময় পা মাটিতে রাখতে পছন্দ করি। অবশ্যই ড্রেসিংরুমে আমরা অনেক উদযাপন করেছি এবং আরও করব। তবে এই জয় নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্ট হতে চাই না। আমরা ভালো ক্রিকেট খেলেছি, সেটি উপভোগ করছি। একই সঙ্গে পরের টেস্টের জন্য আবার প্রস্তুত হতে হবে। কারণ একটি জয় দিয়ে আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশের মানুষের কাছেও এই জয় কতটা গুরুত্ব নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পারছেন?

শান্ত : বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটের প্রতি কতটা আবেগপ্রবণ, সেটি আমরা সবাই জানি। তাই আমি নিশ্চিত, এই জয় তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আমরা অন্তত কিছুটা হলেও তাদের মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছি।

সিনিয়র ক্রিকেটার মুশফিকের অভিজ্ঞতা দলকে কতটা সহায়তা করেছে?

শান্ত : মুশফিক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার এবং টেস্ট ক্রিকেটকে সে সবসময় ভালোবাসে। ২১ বছরের ক্যারিয়ারে শতাধিক টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এটাই ছিল তার প্রথম টেস্ট, তাই তার জন্যও এটি বিশেষ ছিল। একজন সিনিয়র ক্রিকেটার ও ব্যাটসম্যান হিসেবে সে দলকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে। ম্যাচ শেষে স্টাম্প নিয়ে তার উদযাপনটিও ছিল খুব আবেগঘন ও স্মরণীয় মুহূর্ত।

প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

শান্ত : সিমন্সের ভূমিকা অসাধারণ। তিনি খুব শান্ত ও ধীরস্থির মানুষ, বেশি কথা বলেন না। তবে অস্ট্রেলিয়ায় খেলার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তিনি সেটা আমাদের সঙ্গে ভাগ করেছেন। প্রতিদিন তিনি আমাদের বলতেন, মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে এবং চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করতে। তার এই বার্তা আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। দলের মানসিক প্রস্তুতিতেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এবার সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন?

শান্ত : অবশ্যই এই জয় আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তবে আমাদের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। পরের টেস্টেও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে এবং ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ অনেক মানসম্পন্ন, তাই আবারও ব্যাটিংয়ে ভালো করতে হবে। একই সঙ্গে বোলিং ইউনিটকে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে হবে। এই জয় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, কিন্তু এখন আমাদের মনোযোগ পরের ম্যাচে।