কঠিন সময়ে ভারসাম্যমূলক বৈদেশিক সম্পর্কের চেষ্টা

ছয় মাস আগে দায়িত্বগ্রহণ করা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বাস্তবধর্মী ও সমতাভিত্তিক বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা আছে। ভারসাম্যমূলক এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে কিছু পরিকল্পিত ও কৌশলগত উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কিছুটা বিঘিœত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি সংকট এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে তৈরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে।

বাস্তবধর্মী বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগে যুক্ত আছেন সরকারের এমন একজন প্রভাবশালী কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নবগঠিত সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে দেশের পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো, জনশক্তি পাঠানো বহুমুখী করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অসুবিধাগুলো দূর করা। এ ছাড়া সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত মজুদ সত্ত্বেও জরুরিভিত্তিতে জ¦ালানি জোগাড় করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারকে দেশের ভেতরকার ‘রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা’ বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকার কঠিন সময় পার করছে।

 দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গতকাল মঙ্গলবার ছিল তিন হাজার ৭২৫ কোটি ডলার। তবে আইএমএফ মানদ- অনুযায়ী, এ রিজার্ভ তিন হাজার ২৪৪ কোটি ডলার। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু একটি দেশের সম্পর্ক নয়, বহু দেশের সম্পর্ক আছে; এটি হচ্ছে স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক। দেশের স্বার্থে যখন, যেখানে, যার সঙ্গে প্রয়োজন, সরকার সম্পর্ক রাখবে এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সব দেশের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে এবং স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে আমরা সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করেছি।’ 

ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ‘পররাষ্ট্রনীতি’ অংশে প্রতিবেশীসহ সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বাস্তবধর্মী, আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণের কথা বলা আছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কূটনীতি চর্চা, বাণিজ্য সুবিধা রক্ষা, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পদ্মা ও তিস্তাসহ সব আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অংশগ্রহণ বাড়ানো, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং অর্থনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। 

কর্মরত কূটনীতিকরা মনে করেন, তিন দিকে ভূ-সীমান্ত এবং বিশাল সমুদ্রসীমাসহ প্রভাবশালী প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘নিরাপত্তা বিষয়ে  ভারতের স্পর্শকাতরতা’ বিবেচনায় রেখেই সরকার দেশের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

সরকারের একজন কূটনীতিক বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্কের সবকিছু কৌশলগত বিষয় নয়। এ কারণে ‘ভারত অথবা চীন’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র অথবা চীন’ এমন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগে ভারত নয়, চীন যেতে হবে’ এ চিন্তা থেকে চীন সফরটি হয়নি। চীন সফরটি হয়েছে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের দিক থেকে জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে। ‘চীন সফর আগে’ না ‘ভারত সফর আগে’  চিন্তার এই চক্র থেকে সরে আসাও দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ভারতীয় কৌশলগত চিন্তক ড. ব্রহ্ম চ্যালানি গত সোমবার এক এক্স পোস্টে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। অথচ গত ছয় মাস ধরে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াদিল্লি সফরের জন্য “মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণে গড়িমসি করছেন’, যেন এই সফরটি করা ভারতকে কোনো অনুগ্রহ করার শামিল হবে।”

ভারতের সরকার ও সরকারের বাইরের অনেকের এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক বলেন, হিমালয় থেকে দক্ষিণে অবস্থিত সব রাষ্ট্রকে ভারত কেবল নিজের স্বার্থে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে চায়। এ কারণে ভারতীয়রা আশা করে প্রতিবেশী যেকোনো রাষ্ট্রে কেউ নতুন সরকার গঠন করলে তাকে দিল্লি আগে যেতে হবে। ‘এমন আশা ত্রুটিযুক্ত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে নতুন সরকার গঠনের পর নরেন্দ্র মোদি নিজেও তো আগে শুভেচ্ছা সফরে যেতে পারেন। উনি যেতে চাইলে কি কোনো দেশ না বলবে? নিশ্চয়ই না।’

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সফরের জন্য উপযুক্ত ‘পরিবেশ তৈরি’র জন্য বাংলাদেশ সরকারের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিকে সফরের আমন্ত্রণ, অন্যদিকে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নয়াদিল্লি থেকে ‘রাজনীতি করা’র সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ‘চাপ তৈরি’র কৌশল থেকে ভারতের সরে আসা দরকার। দিল্লি থেকে অকারণ ‘খোঁচাখুঁচি’ বন্ধ করা দরকার। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরোপ করা বাধাগুলো দূর করা দরকার।

ওই কূটনীতিক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতে যেতে চেয়েছিলেন। তার সরকারের সঙ্গে দূরত্ব রেখে ভারত সরকার ঠিক করেনি। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলে সম্পর্কের কিছু ধারাবাহিকতা রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারত। ভারতের আমলাতন্ত্রসহ ক্ষমতা কাঠামোতে যারা আছেন ও আসবেন, তাদেরও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জ¦ালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত অব্যাহত রাখার জন্য সরকার ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার দিল্লিতে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘জ¦ালানি সহযোগিতার জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি ব্যবস্থা চালু আছে। অতিরিক্ত জ¦ালানি সরবরাহের জন্য যে অনুরোধ [বাংলাদেশ থেকে] এসেছে, তা [ভারতের] নিজস্ব চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।’

জয়সওয়াল বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা প্রসঙ্গে বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ‘অনুকূল ও গঠনমূলক’ সম্পর্ক চায়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের যে উদ্বেগ ও স্পর্শকাতরতা রয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সতর্ক থাকা দরকার। তাহলে অন্য অনেক বিষয়ে ঝামেলা এড়ানো সহজ হতে পারে।    

 দেশে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো, রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত রাখা, বিদেশে কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং জ¦ালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এরই মধ্যে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। একই কারণে আগামী সেপ্টেম্বরের পর তার সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনা আছে। সৌদি প্রধানমন্ত্রী ও যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান এ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় যুক্ত থাকার অংশ হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বরে তার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তর এবং সানফ্রান্সিসকোতে সিলিকন ভ্যালিতে যাওয়ার কথা রয়েছে।