কলকাতায় পুড়ে যাওয়া হোটেলের অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। অনিয়মের জন্য সাবেক তৃণমূল সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন রাজ্যের বিজেপি সরকার। অপরিসর গলিতে এ ধরনের চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনি হোটেলগুলো কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার পারমিট পেল, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল ‘শিখা ইন’-এ গতকাল ভোররাতে ভয়াবহ আগুনে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সাত বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই সাতজনের মধ্যে চারজন একই পরিবারের।
কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ দেশ রূপান্তরকে জানান, নিহতরা হলেন কুষ্টিয়ার দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, দুই বছরের সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর মো. আকরাম আলী।
দেবাশীষ দত্ত দেশের জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়ার জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কলকাতা গিয়েছিলেন তিনি।
এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে, যারা মূলত চিকিৎসার প্রয়োজনে ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় আরও অনেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হোটেলটিতে আগুন লাগার সময় বেশিরভাগ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। ভবনে কোনো জরুরি নির্গমন পথ না থাকা এবং প্রধান সিঁড়িটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় হুড়োহুড়ির মধ্যে অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। পুলিশ ও দমকল বাহিনীর একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় ২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হোটেল থেকে অন্তত ৬০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মিলে ৯ জনের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মর্মান্তিক এ ঘটনা শহর ও রাজ্যের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফের বড় প্রশ্ন তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে অভিযুক্ত করে তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের আমলের অব্যবস্থা ও গাফিলতির কারণেই এই পরিণতি। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা ও রাজ্যের অবকাঠামো কোনোরকম কার্যকর নজরদারি ছাড়াই গড়ে উঠেছে। বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করে বিভিন্ন ভবনে হোটেল ও ব্যবসায়িক কার্যকলাপ চলেছে।
দুর্ঘটনার পর থেকে হোটেলের মালিক ও পরিচালনাকারীরা পলাতক। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় গতকাল সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে অগ্নিমিত্রা পাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র সময়কার নগর প্রশাসন ও কলকাতা পৌরসভার তীব্র সমালোচনা করেন। নাম উল্লেখ না করে কলকাতার সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘কীভাবে এমন অপরিসর রাস্তায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে বেআইনি হোটেলগুলোকে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল?’
গত ১৫ বছরে এ ধরনের হোটেলে নিয়মিত ফায়ার অডিট কেন করা হয়নি সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি কীভাবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছিল, সেটাও জানতে চান।
অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘হোটেলের পেছনে বেরোনোর জন্য একটি বিকল্প পথ ছিল, কিন্তু সেখানেও অবৈধভাবে নতুন ভবন তুলে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই অব্যবস্থাপনা ও প্রাণহানির দায় সম্পূর্ণভাবে আগের রাজ্য সরকারকে নিতে হবে।’
তিনি জানান, কিছু দিন আগে তারাপীঠের হোটেলে যে ধরনের অগ্নিনির্বাপক গাফিলতি দেখা গিয়েছিল, মির্জা গালিব স্ট্রিটেও ঠিক একই অনিয়ম ও চরম অবহেলার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের অভাব এবং সুরক্ষাবিধি মেনে না চলার কারণেই এই করুণ পরিণতি।
ঘটনার পর মির্জা গালিব স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের দল গঠন করেছে রাজ্য সরকার। দুর্ঘটনার পেছনে যাদের দায় পাওয়া যাবে, তাদের সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিহতদের সবার পরিচয় শনাক্ত করা এবং প্রয়োাজনীয় আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখছেন।