দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি ঠিক করতে নির্বাচন হচ্ছে আজ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুজন প্রার্থী। তবে সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই যাচ্ছেন বঙ্গভবনে। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন। তবে সংসদে বিরোধী জোটের আসন সংখ্যা অনেক কম থাকায় ভোট পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আজ দুপুর ২টায় সংসদ অধিবেশন বসছে। সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে এমপিদের তাদের দলের প্রার্থীর বাইরে কাউকে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
ইতিমধ্যে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা ও সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের বিশ্বাস, সুন্দর একটা নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারব।’
সিইসি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে। সুতরাং এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটা আমার জন্য একটা ভাগ্যের ব্যাপার। দেশবাসী, পুরা জাতি এবং বিশ্ববাসী জানে আমাদের একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।’ এবার ভোটার ৩৪৯ জন উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ‘২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। এখানে আমাদের রাষ্ট্রপতি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরা একেকজন ভোটার, প্রধানমন্ত্রী ভোটার, স্পিকার ভোটার; তেমনি বিরোধী দলের নেতাও ভোটার।’
সিইসি আরও বলেন, ‘প্রথম দিকে যখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার এবং বিরোধীদলীয় নেতা ভোট দেবেন তখন লাইভ টেলিকাস্ট হবে। তারপরে ৫টার সময় ভোট গণনা শুরু করলে আবারও লাইভ টেলিকাস্ট হবে। সংসদ সদস্যরা যেহেতু ভোটার, ভোট দিয়েই চলে যাবেন এমন নয়, তারা উপস্থিত থাকতে পারবেন। এমনকি উনারা ভোট গণনার সময়ও থাকতে পারবেন। এটা খুব স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হবে। সুতরাং এখানে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।’
তিনি বলেন, ‘কোন প্রার্থী কতটি ভোট পেলেন, কতটি ভোট বাতিল বা নষ্ট হলো, সংখ্যাগুলো সব বিস্তারিত আমি ঘোষণা করব। যিনি বিজয়ী হবেন বা যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাবেন, তার নাম ঘোষণা করব। এরপর গেজেট প্রকাশ করব।’ কোনো দলের এমপি অন্য দলের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন কি না, কীভাবে জানবেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘যদি এ ধরনের সিচুয়েশন হয়, তখন আমি দেখব।’
এদিকে জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, ভোটের পরদিন আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) দুপুরে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ হবে। ভোটের ফল প্রকাশের পরপরই গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর ২১ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে।’
এবার রাষ্ট্রপতি পদে লড়াই করছেন দুই মুক্তিযোদ্ধা। সরকারি দল বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হয়েছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিকসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত থাকবেন। সর্বশেষ ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সভাকক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। তখন বিএনপির প্রার্থী হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী। সে সময়ে আওয়ামী লীগের বদরুল হায়দার চৌধুরীকে (৯২ ভোট) পরাজিত করে ১১তম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। তিনি পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট।
‘শারীরিক ও মানসিক’ গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপরেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নির্বাচন ভবনে গত বৃহস্পতিবার সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে বিএনপির পক্ষে দলটির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমেদের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেয় ১১ দলীয় জোট।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভা : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট সামনে রেখে গতকাল বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় বৈঠক করেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা। এতে সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও অংশ নেন।
সভা শেষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম জানান, ‘সরকার এবং বিরোধী দল ইনক্লুসিভ হয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখতে চায়। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কীভাবে ভোটগ্রহণ হয়, এদেশের মানুষ সেটা আবারও প্রত্যক্ষ করবে। এর মাধ্যমে আমরা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করব।’
ব্রিফিংয়ে হুইপ রুহুল কুদ্দস তালুকদার দুলু, মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, জি কে গউছ, সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম আলিম, খন্দকার আবু আশফাক, প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন : রাষ্ট্রপতি নির্বাচন স্থগিত চেয়ে গতকাল আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে করা রিট হাইকোর্টে খারিজ হওয়ার পর তিনি আপিল বিভাগে আবেদনটি করেন।
হাইকোর্ট গত মঙ্গলবার ইউনুছ আলী আকন্দের রিট সরাসরি খারিজ করে দেয়। বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদনের পর ইউনুছ আলী আকন্দ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে আবেদনটি করা হয়েছে। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এর ওপর শুনানি হতে পারে।’