থাইরয়েডের নীরব সংকেত চিনুন

ডা. এ হাসনাত শাহীন

ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ

আমাদের গলার সামনে অবস্থিত প্রজাপতির আকৃতির ছোট্ট গ্রন্থি থাইরয়েড। আকারে ছোট হলেও এটি নিঃসৃত থাইরক্সিন (ঞ৪) ও ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (ঞ৩) হরমোন শরীরের বিপাক ক্রিয়া, হৃৎস্পন্দন, তাপমাত্রা ও শক্তি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। হরমোন কম উৎপাদিত হলে হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দেয়। ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা। বেশি উৎপাদিত হলে হাইপারথাইরয়েডিজম ওজন কমা, অস্থিরতা, বেশি ঘাম হওয়া। গলগ-, নডিউল ও থাইরয়েড ক্যানসারও হতে পারে। নারীরা, বিশেষত গর্ভাবস্থায়, এতে বেশি আক্রান্ত হন। রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শে এই সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

মানুষের বৃদ্ধি, বিকাশ, শারীরবৃত্তিক আর বিপাকীয় নানা ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় এই হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গ্রন্থি হতে নিঃসৃত হরমোনের ঘাটতি বা আধিক্য হলে শরীরে দেখা দেয় নানা বিপত্তি। এর মধ্যে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিজনিত ‘হাইপোথাইরয়েডিজম’ রোগীর সংখ্যাই বেশি। এটি থাইরয়েডের সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা।  সাধারণত পুরুষেরা তুলনায় মহিলাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রত্যেক আটজন মহিলার মধ্যে একজন হাইপোথাইরয়েডিজমের সমস্যায় ভুগে থাকেন। থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিজনিত প্রতিক্রিয়াটা ধীরে ধীরে পরিলক্ষিত হয় বলে বেশিরভাগ রোগী সমস্যা বুঝতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে রুটিন পরীক্ষার সময় থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অটোইমিউন কারণে এটি দেখা দেয়। এ ছাড়া থাইরয়েডের অস্ত্রোপচার, থাইরয়েড গ্রন্থির প্রদাহ, আয়োডিনের ঘাটতি, রেডিয়েশন ও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে। নবজাতকদের সাধারণত কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দেয়। হাইপোথাইরয়েডিজম আক্রান্ত ব্যক্তির অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ, ওজন বেড়ে যাওয়া, শীত শীত ভাব, অবসাদ, চুল ও ত্বকের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মহিলাদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিক বা অতিরিক্ত মাসিক, গর্ভধারণে অক্ষমতা, অকাল গর্ভপাত প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে। নবজাতকদের ক্ষেত্রে দৈহিক ও মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশ ব্যাহত হয়, এমনকি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হতে পারে।

হাইপারথাইরয়েডিজমের থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে থাইরয়েড হরমোন বেশি নিঃসৃত হয়। এর ফলে বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম, বারবার ক্ষুধা লাগা, ওজন কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত গরম লাগা, মহিলাদের মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা কম হওয়া, বন্ধ্যত্ব প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যাওয়াকে গয়টার বা গলগ- বলে। হাইপোথাইরয়েডিজম, হাইপারথাইরয়েডিজম, থাইরয়েড ক্যানসার যে কোনো কারণেই এটি হতে পারে। এটি হলে সবক্ষেত্রেই অপারেশন জরুরি নয়।

মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবে থাইরয়েডের রোগী চিকিৎসকের কাছে কম আসে। বয়স ও লিঙ্গভেদে ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গ ও জটিলতা দেখা যায়। অনেক সময় উল্লেখযোগ্য কোনো উপসর্গ না থাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারেন না। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে এটি শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। তাই থাইরয়েডের বিপত্তিজনিত কারণে যেসব লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় তা সম্পর্কে অবগত হতে পারলে এই রোগের ব্যাপারে সচেতন হওয়া সম্ভব। আর সন্দেহজনক যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে বা থাইরয়েডের বিপত্তি শনাক্ত হলে অবশ্যই একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।