মাথাব্যথার ধরন বুঝে চিকিৎসা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৭ এএম

মাথাব্যথা খুব পরিচিত শারীরিক সমস্যা। কখনো সামান্য চাপ বা ভারী লাগা, কখনো মাথার এক পাশে তীব্র স্পন্দন, আবার কখনো হঠাৎ এমন প্রচন্ড ব্যথা শুরু হতে পারে, যা ভুক্তভোগীকে আতঙ্কিত করে তোলে। অনেকেই সব ধরনের মাথাব্যথাকে একইভাবে দেখেন এবং ব্যথা হলেই ওষুধ খেয়ে নেন। কিন্তু মাথাব্যথার ধরন এক নয়। ব্যথার অবস্থান, তীব্রতা, স্থায়িত্ব, সঙ্গে থাকা অন্যান্য উপসর্গ এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্যথা শুরু হচ্ছে এসবের ওপর ভিত্তি করে এর কারণও ভিন্ন হতে পারে। লিখেছেন নাহিন আশরাফ

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাথাব্যথাকে সাধারণভাবে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি এই দুই ভাগে দেখা হয়। প্রাইমারি মাথাব্যথায় মাথাব্যথাই মূল সমস্যা। অন্যদিকে সেকেন্ডারি মাথাব্যথা শরীরের অন্য কোনো সমস্যা বা রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাই বারবার মাথাব্যথা হলে শুধু ব্যথা কমানোর চেষ্টা না করে এর ধরন ও কারণ বোঝাও জরুরি।

টেনশন হেডেক : চাপ ও ক্লান্তির সঙ্গে ব্যথা

সবচেয়ে পরিচিত মাথাব্যথার একটি হলো টেনশন হেডেক। সাধারণত মাথাজুড়ে চাপ বা ভারী ধরনের ব্যথা অনুভূত হয়। কপাল, ঘাড়, মাথার ত্বক কিংবা কাঁধের পেশিতেও অস্বস্তি থাকতে পারে। অনেক সময় বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান, ঘুম এবং স্ট্রেস কমানোর মাধ্যমে উপকার পাওয়া যায়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ ব্যথানাশকও ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাইগ্রেন : শুধু মাথাব্যথা নয়

মাইগ্রেন সাধারণ মাথাব্যথার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। এর সঙ্গে আলো ও শব্দে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব কিংবা বমি হতে পারে। চিকিৎসা না করলে মাইগ্রেনের আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ঘুমের পরিবর্তন, না খেয়ে থাকা, পানিশূন্যতা, কিছু খাবার কিংবা হরমোনের ওঠানামা মাইগ্রেনের ট্রিগার হতে পারে।

ক্লাস্টার হেডেক : অল্প সময়ে প্রচন্ড ব্যথা

ক্লাস্টার হেডেক তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এর ব্যথা অত্যন্ত তীব্র হতে পারে। সাধারণত এক চোখের আশপাশে বা মুখের এক পাশে তীব্র জ্বালাপোড়া কিংবা ছুরিকাঘাতের মতো ব্যথা হয়। মাথাব্যথা একবার এসে শেষ হওয়ার বদলে নির্দিষ্ট সময় ধরে বারবার হতে পারে। তাই এমন উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

         কয়েক সেকেন্ডের তীব্র ব্যথাও হতে পারে আলাদা ধরনের। কিছু মানুষের মাথায় হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের জন্য খুব তীক্ষè, ছুরির খোঁচার মতো ব্যথা হয়। এটিকে আইস-পিক হেডেক বা প্রাইমারি স্ট্যাবিং হেডেক বলা হয়। ব্যথা খুব অল্প সময় স্থায়ী হলেও দিনে একাধিকবার হতে পারে। ব্যথা যদি বারবার একই নির্দিষ্ট জায়গায় হতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকে জানানো ভালো।

         হরমোনের পরিবর্তনেও মাথা ধরতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্রের সঙ্গে মাথাব্যথার সম্পর্ক থাকতে পারে। গর্ভাবস্থা বা হরমোনাল জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সঙ্গেও কারও কারও মাথাব্যথার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যদি প্রতি মাসে একই সময় মাথাব্যথা হওয়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে কখন ব্যথা হচ্ছে লিখে রাখা ও চিকিৎসকে জানানো।

         অনেকে নিয়মিত চা বা কফি পান করেন। প্রতিদিনের নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যাফেইনে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেলে হঠাৎ তা বন্ধ করার পর মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইনও কিছু মানুষের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে পরিমাণ হঠাৎ পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে কমানো ভালো।

         ব্যায়ামের পর মাথাব্যথা হলে সতর্ক থাকুন। দৌড়ানো, ভারী ওজন তোলা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের পর কারও কারও মাথায় দ্রুত স্পন্দনশীল ব্যথা শুরু হতে পারে। একে এক্সারশন হেডেক বলা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

         মাথা ধরলেই বারবার ব্যথানাশক খাওয়ার অভ্যাস উল্টো সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ব্যথা কমানোর জন্য যে ওষুধ নেওয়া হচ্ছে, অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরবর্তী সময়ে ঘন ঘন মাথাব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত মাথাব্যথা হলে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মাথাব্যথা যখন জরুরি সংকেত : সব মাথাব্যথা বিপজ্জনক নয়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মাথাব্যথা যদি হঠাৎ বজ্রপাতের মতো তীব্র হয়ে এক মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে যায়, অবহেলা করা উচিত নয়। মাথাব্যথার সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, জ¦র, বিভ্রান্তি, বারবার বমি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। খুব উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা ও দৃষ্টির পরিবর্তন, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলেও জরুরি চিকিৎসা দরকার হতে পারে।

মাথাব্যথা কমাতে দৈনন্দিন অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ : পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এসব মাথাব্যথার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বারবার মাথাব্যথা হলে হেডেক ডায়েরি রাখা যেতে পারে। কখন ব্যথা শুরু হলো, কতক্ষণ থাকল, মাথার কোন অংশে হলো, কতটা তীব্র ছিল এবং তার আগে কী খাওয়া হয়েছিল বা কতটা ঘুম হয়েছিল এসব লিখে রাখলে সম্ভাব্য ট্রিগার শনাক্ত করা সহজ হয়।

মনে রাখা দরকার, মাথাব্যথা নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। ব্যথার পেছনে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথাকে শুধু সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ব্যথার ধরন বোঝা, সতর্কতার লক্ষণগুলো চেনা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত