টিকার পরও কেন হামের বিস্তার

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ এএম

কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল

হাম প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর। একটি ডোজ টিকা হাম প্রতিরোধে প্রায় ৯৩% কার্যকর এবং দুই ডোজের কার্যকারিতা প্রায় ৯৭%। অর্থাৎ টিকা নেওয়ার পর খুব অল্পসংখ্যক মানুষের সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকতে পারে, তবে টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। কিন্তু টিকা প্রদান সত্ত্বেও হামের বিস্তার কমছে না। টিকা না পাওয়া, অসম্পূর্ণ টিকাদান, জনসংখ্যার মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি এবং হাম ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার ইত্যাদি কারণগুলো কাজ করছে।

টিকার আওতায় না আসায় সংক্রমণ

হাম এতটাই সংক্রামক যে, এর সংক্রমণ প্রতিরোধে একটি জনগোষ্ঠীতে প্রায় ৯৫% বা তার বেশি মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা প্রয়োজন। একটি এলাকার সামগ্রিক টিকাদানের হার ৯০%। কাগজে-কলমে ৯০% শুনতে ভালো শোনালেও হাম প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট নয়। ১০% টিকা-বঞ্চিত শিশু যদি একই মহল্লা, বস্তি, শরণার্থী শিবির বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে সেখানে সংক্রমণের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পকেট তৈরি হয়। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, বর্তমানে হামে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাপ্রাপ্ত নয় অথবা পুরো ডোজ সম্পন্ন করেনি। আক্রান্তদের বড় অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী এবং সন্দেহভাজন মৃত্যুর বড় অংশ ছিল দুই বছরের কম বয়সী, বিশেষ করে টিকা না পাওয়া শিশু। এমনও দেখা যাচ্ছে যে, টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে।

এক ডোজ ও দুই ডোজে পার্থক্য

এক ডোজ টিকা অত্যন্ত কার্যকর হলেও শতভাগ নয়। প্রথম ডোজের পর কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। দ্বিতীয় ডোজের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রথম ডোজে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি না হওয়া শিশুদের সুরক্ষিত করা। অতএব, ‘একবার টিকা দেওয়া হয়েছে’ এবং ‘দুই ডোজ সম্পূর্ণ হয়েছে’ এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না। কারণ এক ডোজে ৯৩% এবং দুই ডোজে সাধারণত ৯৭% শিশু হাম থেকে সুরক্ষা পায়।

টিকা কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের প্রভাব

টিকাদান ব্যবস্থায় ঘাটতিও কয়েক বছর পর বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ যে শিশুরা নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তারা হাম সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সম্পর্কে হু-এর ২০২৬ সালের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০২৪-২০২৫ সালে টিকা প্রদানের ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রয়েছে।

হার্ড ইমুনিটিতে ঘাটতি

হাম অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে এবং সংক্রমিত ব্যক্তি চলে যাওয়ার পরও বদ্ধ পরিবেশে ভাইরাস কিছু সময় সংক্রমণক্ষম থাকতে পারে। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি, স্কুল, হাসপাতাল কিংবা পরিবারের মধ্যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে সংক্রমিত করতে পারেন। এ কারণেই হাম নিয়ন্ত্রণে ৯০ শতাংশ কভারেজ যথেষ্ট নয়; ৯৫ শতাংশের বেশি টিকা প্রদানের মাধ্যমে হার্ড ইমুনিটি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টিকা নেওয়ার পরও শিশু সংক্রমিত

কোনো টিকাই শতভাগ কার্যকর নয়। দুই ডোজ হামের টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৯৭% হলেও অল্পসংখ্যক টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারেন। এ ছাড়া প্রাদুর্ভাবের সময় অনেক ক্ষেত্রে টিকাপ্রাপ্ত শিশুরা ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে এমন সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি সাধারণত বিরল এবং টিকাদান ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ও গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমায়।

অপুষ্টি: হাম বিস্তারে সহযোগী

হামের ক্ষেত্রে শুধু ভাইরাসের সংক্রমণ নয়, শিশুর সামগ্রিক পুষ্টিগত অবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপুষ্ট শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। অপুষ্ট শিশুর টিকা পাওয়ার পরও অনেক সময় পর্যাপ্ত প্রতিরোধী এন্টিবডি তৈরি করতে পারে না।  হামের অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিও হামের জটিলতা বাড়াতে পারে।

অ্যাডিনোভাইরাসও কারণ!

হামের রোগীর মধ্যে অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সহসংক্রমণ ঘটলে রোগের তীব্রতা বেড়ে যায়। গবেষণায় অ্যাডিনোভাইরাসসহ অন্যান্য জীবাণুর সহসংক্রমণও হাম রোগের প্রাদুর্ভাবকে দায়ী করছে।

ইমিউন অ্যামনেশিয়া

হামের সংক্রমণের পর ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ বা রোগপ্রতিরোধ স্মৃতির দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ ভাইরাসটি শরীরের এমন কিছু মেমোরি কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যেগুলো আগে পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে সক্ষম। ফলে হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও কিছু সময় শিশুটি অন্যান্য সংক্রমণের প্রতি বেশি ঝুঁকিপ্রবণ হয়ে পড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত