ডা. কামরুন নাহার
গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, জয়নুল হক সিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল
বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই অনেক মেয়ের পলিসিস্টিক ওভারি সমস্যা দেখা দেয়। অত্যধিক ফাস্ট ফুড খাওয়া, সেডেন্টারি জীবনযাত্রাই এর প্রধান কারণ। এ ছাড়া হরমোনাল কিছু অসামঞ্জস্য তো আছেই। অনেক সময় হয় কোনো প্রকার পরীক্ষা-নীরিক্ষা না করানোর কারণে জানতেই পারা যায় না এ রকম কোনো সমস্যা শরীরে রয়েছে।
পলিসিস্টিক ওভারি কী : সিস্ট হলো ছোট পানি ভরা থলি, আর একাধিক সিস্টকে একসঙ্গে বলা হয় পলিসিস্ট। ছোট ছোট সিস্ট পুঁতির মালার মতো দেখতে ওভারি বা ডিম্বাশয়কে ঘিরে থাকে। পলিসিস্টিক ওভারির ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি সমস্যা হয়, একটি পিসিওডি এবং আরেকটি পিসিওএস। এই দুটির উপসর্গ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক হলেও কারণ কিন্তু ভিন্ন।
পিসিওডি পলিসিস্টিক ওভারিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি দেখা যায়, যা প্রধানত হরমোনাল অসামঞ্জস্যতার জন্য হয়। আরেকটি হলো পিসিওএস অর্থাৎ পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। যা কিনা একটি এন্ডোক্রিন সিস্টেম ডিসঅর্ডার। এই অবস্থায় ওভারিতে প্রচুর এন্ডোজেন তৈরি হয়, যা ডিম্বাণু তৈরি ও নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে। এই ডিম্বাণুগুলোর কয়েকটা তরল পূর্ণ সিস্টে পরিণত হয়ে ওভারিতে জমা হয় ও একে ফুলিয়ে দেয়। যেকোনো বয়সের নারীরই মেনার্কি থেকে মেনোপজ পর্যন্ত হতে পারে।
কারণ : সঠিক কারণ এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং হরমোন ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি জেনেটিক্সকে অবশ্যই ফ্যাক্টর বলে মনে করা হয়। একজন নারীর পিসিওএস হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় যদি তার মা, বোন বা ফুফুর মতো পরিবারের কারও পিসিওএস থাকে।
প্রায় ৮০ শতাংশ নারী যাদের পিসিওএস নির্ণীত হয় যদি তাদের ইনসুলিন প্রতিরোধ থাকে। এ ক্ষেত্রে শর্করা ভাঙার জন্য অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরির জন্য শরীরকে অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করতে হয়। এটি আবার, টেস্টোস্টেরনের অতিরিক্ত উৎপাদন করতে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করতে পারে, যা তারপর ফলিকলগুলোর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। এটি প্রায়ই ডিম্বস্ফোটনকে অনিয়মিত করে তোলে। জেনেটিক কারণের সঙ্গে সঙ্গে লাইফস্টাইলের কারণগুলোও ইনসুলিন প্রতিরোধের একটি সাধারণ কারণ। ওজন বেশি হওয়া হচ্ছে ইনসুলিন প্রতিরোধের আরেকটি কারণ।
লক্ষণ : মেনস্ট্রুুয়াল সাইকেল অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে গেল।
দেহের বিভিন্ন জায়গায় অবাঞ্ছিত চুলের বৃদ্ধি দেখা যাবে।
মাথার চুল পাতলা হয়ে যাবে। ব্রণের সমস্যা না কমা।
ওজন বেড়ে যাওয়া। দেহে তৈরি হবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।
স্ট্রেস বাড়তে থাকবে।
সমাধান : উপায় কিন্তু মাত্র দুটি, ওজন কমানো ও হরমোনাল সাইকেল ঠিক করা। সুষম খাদ্য ও যোগব্যায়াম এই দুটিই সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। একটা ব্যালান্সড উপায়ে ওজন কমানোটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
পিসিওডি এবং পিসিওএসের মধ্যে পার্থক্য : পিসিওএস হলো একটি সিন্ড্রোম, যেখানে অনেক সিস্ট (তরল পদার্থে ভরা থলি) মহিলাদের উভয় ডিম্বাশয়ে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এগুলো বড় এবং প্রায়ই অপরিণত ডিমের পাশাপাশি অন্যান্য নিঃসরণ থেকে তৈরি হয়। এ কারণে নারীদের পিরিয়ডের সমস্যায় পড়তে হয়। সাধারণত, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সনাক্ত করা হয়, বেশিরভাগই প্রথম পিরিয়ডের সময়।
অন্যদিকে পিসিওডির ডিম্বাশয়ের ওপর একই রকম প্রভাব রয়েছে, তবে সেগুলো প্রকৃতিতে ছোট। ডিম্বাশয়ে ছোট সিস্ট তৈরি হয়, যা তিন মাসের মধ্যে সরে যেতে পারে (জীবনযাত্রায় পরিবর্তন প্রয়োজন) এবং সংখ্যায়ও কম। চঈঙউ-এ, পিরিয়ড স্বাভাবিক এবং কখনো কখনো বিলম্বিত হয়। পিসিওডি ধরা পড়ে যখন সন্তান জন্মদানের বয়সের গর্ভধারণ করতে সক্ষম হয় না। পিসিওডি ও পিসিওএসের চেয়ে বেশি প্রচলিত। হরমোনের কর্মহীনতার কারণে পিসিওএস গর্ভধারণকে কিছুটা কঠিন করে তোলে।