শেকৃবির উদ্ভাবন

পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজিতে নতুন বিপ্লব স্মার্ট ড্রায়ার

মেঘলা আকাশে যখন সূর্য মুখ লুকায়, সমুদ্র উপকূল কিংবা নদীর পাড়ে তখন নেমে আসে এক নিঃশব্দ হাহাকার। কয়েক দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে জলরাশির বুক চিরে আহরণ করা রুপালি মাছগুলো যখন চাটাই কিংবা মাচায় বিছিয়ে দেওয়া হয় মৎস্যজীবীর ব্যাকুল চোখ দুটো ভেসে থাকে আকাশের পানে। একটুখানি মিষ্টি রোদের প্রতীক্ষা। কিন্তু হঠাৎ নেমে আসা অঝোর বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা আর মাছি-পোকামাকড়ের আনাগোনা মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেয় দিনরাত্রির স্বপ্ন। পচন ধরে মাছের শরীরে, বাতাসে ভেসে বেড়ায় দুর্গন্ধ আর হতাশার দীর্ঘশ্বাস।

শুধু মাছ কিংবা শুঁটকি নয়; ভরা মৌসুমে মাঠের পর মাঠ ফলে থাকা সুমিষ্ট আম, কাঁঠাল, কলা কিংবা সবুজ সবজি সংরক্ষণের মোক্ষম উপায়ের অভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নষ্ট হয়। প্রকৃতির এই অনিয়ন্ত্রিত খামখেয়ালিপনা আর ঐতিহ্যবাহী শুকানোর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা যুগ যুগ ধরে আমাদের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের দিয়েছে কেবল আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের বোঝা।

আঁধার রাতে রোদের আলো শেকৃবি স্মার্ট ড্রায়ার

প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনাকে জয় করতে এবং পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি বা সংগ্রহ-পরবর্তী বিপুল অপচয় রুখে দিতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ নিয়ে এসেছে এক অনন্য প্রযুক্তিগত বিপ্লব ‘IoT-Based SAU Smart Dryer’। বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানার দূরদর্শী নেতৃত্বে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিটি কেবল একটি ড্রায়ার বা শুকানোর যন্ত্র নয়; যেন রোদের উত্তাপকে একটি ফ্রেমে বন্দি করে রাখার আধুনিক কারিগরি। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা খোলা আকাশের নিচে মাছ শুকানোর বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ধুলাবালিযুক্ত পদ্ধতির বিপরীতে এটি গড়ে তুলেছে এক শতভাগ সুরক্ষিত, নিয়ন্ত্রিত ও হাইজিনিক পরিবেশ।

প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় ও নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ

ড্রায়ারটির ভেতরে রয়েছে ৪টি অত্যাধুনিক এক্সজস্ট ফ্যান, যা মাছ বা কৃষিপণ্য থেকে বের হওয়া অতিরিক্ত আর্দ্রতা দ্রুত বাইরে বের করে দেয়। পাশাপাশি ৮টি রোটেটিং ফ্যান ভেতরের তাপকে প্রতিটি র‌্যাকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। উচ্চসহনশীল পলিথিনের দেয়াল থাকায় এতে মাছি বা কোনো পোকামাকড় ঢুকতে পারে না। ফলে বিষাক্ত কেমিক্যাল বা পোকামাকড়নাশকের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না তৈরি হয় সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সেন্সর ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক IoT প্রযুক্তি। উদ্যোক্তা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই থাকুন না কেন, এক ক্লিকেই ড্রায়ারের ভেতরের পরিবেশগত প্যারামিটার দেখতে পান এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

সময় বাঁচে ৬০ শতাংশ, অপচয় কমে ৪০ শতাংশ

প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ বা কৃষিপণ্য দিনে মাত্র ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা শুকানোর সুযোগ মেলে। কিন্তু এই স্মার্ট ড্রায়ারে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ চলায় শুকানোর সময় দিন হিসেবে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। যেখানে খোলা আকাশে শুঁটকি তৈরি হতে দিন কেটে যেত, সেখানে কয়েক ঘণ্টার নিখুঁত তাপে তৈরি হয় বিশ্বমানের শুঁটকি। উদ্ভাবকের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটির সঠিক ব্যবহারে কৃষি ও মৎস্যপণ্যের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি বা পোস্ট-হারভেস্ট লস প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। কাঁচামাল থেকে ১০০টিরও বেশি মূল্যসংযোজিত পণ্য এই স্মার্ট ড্রায়ার দিয়ে শুধু মাছ নয়, বরং স্থানীয়ভাবে পাওয়া কাঁচামাল থেকে তৈরি করা সম্ভব ১০০টিরও বেশি উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত পণ্য।

ফলমূল : আমের পাউডার, শুকানো আনারস স্ল্যাইস, কলার পাউডার।

সবজি ও মসলা : বিটরুট পাউডার, করলার পাউডার, কাঁচা মরিচ ও ধনিয়া পাতার পাউডার।

ভেষজ ও পানীয় : সুবাসিত রোজেলা চা, লেমন চা।

মাছ ও প্রোটিন : নিরাপদ শুঁটকি, ফিশ জার্কি, বিফ জার্কি ও কাঁঠালের পাউডার।

কদর বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে

স্মার্ট ড্রায়ার প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (BFDC) ও মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরেজমিনে স্থাপন ও পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে এটি অর্জন করেছে দারুণ সন্তুষ্টি। দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এটি বাণিজ্যিকভাবে স্থাপন করে উৎপাদিত নিরাপদ শুঁটকি স্থানীয় বাজারে সাধারণ শুঁটকির তুলনায় অনেক বেশি মূল্যে বিক্রি করছে এবং বিদেশে রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছে।

উপকূলীয় ও মৎস্যপ্রধান এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও যুবকদের কর্মসংস্থানে এই প্রযুক্তি এক নতুন আশা জাগাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক আম, কাঁঠাল, কলা বা মাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে স্থানীয় ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং শিল্প। অনিশ্চিত আবহাওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শেকৃবির এই স্মার্ট ড্রায়ার কেবল ফসল বাঁচানোর যন্ত্র নয় এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি-মৎস্যভিত্তিক রপ্তানির এক সোনালি সম্ভাবনার নাম।