দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট ময়মনসিংহ শহরের উপকণ্ঠ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গড়ে ওঠে সবুজের চাদরে মোড়ানো ১২৩১ একরের মেঠো অরণ্য। দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার পথচলার ৬৫ বছর পেরিয়ে গেছে। সঙ্গে যুক্ত করেছে তার ঐতিহ্য, গৌরব আর হাজারো অর্জন। শুরুতে ভেটেরিনারি ও কৃষি দুই অনুষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই পরে পশুপালন, কৃষি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে বাকৃবি থেকে স্নাতক পর্যায়ে দশটি ডিগ্রি প্রদান করা হয়, যার সর্বশেষ সংযোজন স্কুল অব ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি। এছাড়া ছয়টি অনুষদের অধীনে ৪৪টি বিভাগ ও স্বতন্ত্র ৬টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। বর্তমানে ৭ হাজার ৭৬০ জন শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি অধ্যয়নরত আছেন। গত ৬৫ বছরে বাকৃবি তৈরি করেছে ষাট সহস্রাধিক গ্র্যাজুয়েট। তার মধ্যে আছেন এমিরেটাস অধ্যাপক, একুশে পদকজয়ী একাধিক শিক্ষক, মন্ত্রীসহ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সফল উদ্যোক্তা।
দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলার মানুষের খাদ্যের সব চাহিদা পূরণ ও দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিসম্পদ, মৎস্যসম্পদ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দেশের কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করছে। ১৯৬১ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাকৃবির রয়েছে অসংখ্য গৌরবময় অর্জন। যার মধ্য বাউ-৬৩, বাউকুল, বাউ-২, উফশী ধান জাত ও সম্বল, ন্যানো বায়োচার কোটেড ন্যানো ইউরিয়া সার, ক্ষতিকর রাসায়নিক বিকল্প ‘পিজি ট্রাইকোডার্মা’ ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন, সামুদ্রিক শৈবাল থেকে রঞ্জক অ্যাগার তৈরি, স্বাদুপানির অনুশৈবাল ব্যবহার করে দেশের প্রথম একোয়াফিড প্রযুক্তি উদ্ভাবন, স্বল্প ব্যয়ের মাছের খাদ্য উৎপাদন প্রভৃতি। মানুষ ও পশুর ব্রুসেলোসিস রোগের জীবাণু শনাক্তকরণ, ইলিশ মাছ ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জিন রহস্য উন্মেচন, হিমায়িত ভ্রুণ থেকে ভেড়ার কৃত্রিম প্রজনন অন্যতম। গত ছয় দশকেরও বেশি সময় থেকে বাকৃবি বিশ্বদরবারে উচ্চতর শিখায় তুলে ধরেছে দেশকে। এর সঙ্গে এসেছে টানা তিন বছর দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি। এছাড়া ভেটেরিনারি শিক্ষা, লাইফ সায়েন্সে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বে আজ অনন্য বাকৃবি।
মূল চালিকাশক্তি শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সুনাম ধরে রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের কোলাহলে সবসময় মুখরিত থাকে ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রাঙ্গণ। ক্যাম্পাস জীবনের দীর্ঘ এই পথ চলায় কেবল পড়াশোনাই শেষ কথা নয়, বরং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, হল জীবনের রোমাঞ্চ, শিক্ষা সফর, নৌকাভ্রমণ, বর্ষবরণসহ নানা উৎসবের স্মৃতি আজীবন মনে দোলা দেয়। রাতে ঘুমাতে যতই দেরি হোক না কেন মোবাইলের অ্যালার্ম ঠিকই জানিয়ে দেয় সকাল ৮টায় ক্লাস আছে। তাইতো চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছুটতে ছুটতে ক্লাসে উপস্থিত হন শিক্ষার্থীরা। এটি নিত্যদিনের ঘটনা। ক্লাস, ল্যাব, ফিল্ড ওয়ার্ক সামলাতেই কেটে যায় সারা দিন। সারা দিনের ক্লান্তি থাকলেও থেমে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিকেলে লাইব্রেরিতে বইয়ের পাতা ওল্টানো আর রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট, প্র্যাকটিক্যাল লেখা আর প্রেজেন্টেশনের জন্য নিজেকে তৈরি করা। এত ব্যস্ততার মধ্যেই তৈরি হয় বন্ধুত্ব, গল্প ও স্মৃতি যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পরও স্মৃতির পাতায় আজীবন থেকে যায়। সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি পথ যেন সাক্ষী হয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের।
প্রকৃতিকন্যা
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাকৃবি যেন নতুন রূপ ধারণ করে। গ্রীষ্মের শুরুতে ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলোর দুপাশে ফোটে লাল কৃষ্ণচূড়া, বেগুনি জারুল, সোনালি রঙের সোনালু ফুল আর সমাবর্তনের রঙিন বাগানবিলাস। সব মিলে প্রকৃতি যেন উৎসবে মেতে ওঠে। বর্ষায় ব্রহ্মপুত্র নদ ও সবুজ অরণ্য ধুয়ে মুছে শান্ত, সজীব রূপ নেয়। শরতে ব্রহ্মপুত্রের পাশে স্নিগ্ধ কাশবনের মেলা বসে। হেমন্তে সোনালি ধানক্ষেতে যেন গ্রামবাংলার অপরূপ দৃশ্য তুলে ধরে। শীতের কুয়াশার চাদর আর হালকা মিষ্টি রোদ ক্যাম্পাসে তৈরি করে এক মায়াবী আবহ। আর শীতের বিদায়ে বসন্ত আসতেই শিমুল, পলাশের রঙ আর কোকিলের ডাকে বাকৃবি যেন প্রাণ ফিরে পায়। তাইতো বাকৃবিকে বলা হয় প্রকৃতিকন্যা।
অনন্য স্থাপত্য ও নিদর্শন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাকৃবির রয়েছে অনন্য স্থাপত্য ও নিদর্শন। বাকৃবিতে আছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ জার্মপ্লাজম সেন্টার, দৃষ্টিনন্দন বোটানিক্যাল গার্ডেন। আছে দেশের সর্ববৃহৎ কৃষি ও মৎস্য জাদুঘর, দ্বিতীয় বৃহত্তম এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, অত্যাধুনিক ল্যাব, দেশের একমাত্র গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। যুগে যুগে শিক্ষার্থীদের পদচিহ্ন ও মধুর স্মৃতিতে অমলিন থাকুক ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই ক্যাম্পাস। এগিয়ে নিয়ে যাক দেশের কৃষিক্ষেত্রকে এবং অবদান রাখুক যোগ্য দক্ষ কৃষিবিদ তৈরিতে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ