বরাদ্দ পাওয়া সার উত্তোলনে গড়িমসি করা যাবে না বলে ডিলারদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে যারা বরাদ্দ সময়মতো উত্তোলন নিয়ে সংকট তৈরির চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত এক সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বিভিন্ন জেলার ডিসি এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের এসব নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
জানা গেছে, সারা দেশে সার নিয়ে অরাজকতা তৈরি করছে ডিলারদের একটি অংশের সিন্ডিকেট। যারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নিজেদের বরাদ্দ উত্তোলন না করেই সারের সংকট বলে প্রচার করে যাচ্ছে। এতে করে বাড়তি দামে সার কেনাসহ নানাভাবে হয়রানিতে পড়েছে কৃষক। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেকগুলো জেলার ডিলাররা নিজেদের বরাদ্দ না তুলেই ক্রাইসিসের কথা প্রচার করেছে। অনেকে আবার গুদামে সার রেখে বেশি দামে বিক্রি করেছে। এ পরিস্থিতি নিরসনে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বৈঠক হয়। যারা এ সংকট তৈরির চেষ্টা করছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নজরদারি এবং কেন এ অবস্থা তৈরি হয়েছে তার প্রকৃত কারণ খুঁজতে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবসহ ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে দিয়েছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বিভিন্ন জেলার ডিসি ও কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে নিয়ে একটি বৈঠক করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ডিলাররা যাতে বরাদ্দের সার উত্তোলনে কোনোভাবেই গড়িমসি না করেন। শুধু তাই নয়, সার উত্তোলন ও বিক্রির সব বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা যে পরিমাণ সার বিক্রি করবে তার পুরোটাই রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। সঙ্গে ক্রেতাকে বিক্রির রসিদ প্রদানের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। যাতে কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করতে না পারে। এর জন্য অবশ্য ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দোকানে দোকানে অবশ্যই ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সরকারি মূল্য তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙানোর বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যারা এসব নিয়ম মানবে না তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সার ব্যবস্থাপনার নতুন নীতিমালা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের এখনই বাতিল করে দেওয়ার যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তা নিয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে খুচরা বিক্রেতারা তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখবে। এখনই তাদের বাতিল করা হচ্ছে না। যখন নতুন ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত হবে এবং তাদের বিক্রয় প্রতিনিধি এ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে তখনই খুচরা বিক্রেতাদের কার্যক্রম বন্ধ হবে।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে নির্ধারিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সার নিয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কৃষকদের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত সার আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। ফলে সামনে সারের কোনো ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুদামে মোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার মজুদ রয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে মজুদ ছিল প্রায় ১৩ লাখ টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার মজুদ বেড়েছে। তবে দেশের কোথাও কোথাও সার বিতরণে অনিয়মের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সার বিতরণে কিছুটা অনিয়ম রয়েছে। কৃষক ও জনগণের স্বার্থে সরকার বিতরণব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। নতুন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে কোথাও কোথাও কিছুটা অস্থিরতা ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে আমন মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে কৃষককে। প্রতি বস্তায় ৩শ থেকে ৭শ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে কৃষককে। আবার কোথাও কোথাও সারের সরবরাহ নেই বলে প্রচারণা রয়েছে এবং কৃষক সার কিনতে পারছেন না। এ কারণে সারা দেশের কৃষকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা আন্দোলনে নামছে। সম্প্রতি একটি গুদামে সার লুটের ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারও জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।