১৪১ কোটি টাকা আত্মসাৎ

সাবেক ভূমিমন্ত্রীসহ ২৯ জনের নামে দুদকের মামলা

সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মোকারম হোসেন জানান, আজ (গতকাল) চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১ এ পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে। দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপরিচালক মো. মশিউর রহমান, উপসহকারী পরিচালক মো. সজীব আহমেদ এবং সহকারী পরিচালক মো. শোয়াইব ইবনে আলম বাদী হয়ে এসব মামলা করেন।

তিন মামলায় আসামি হিসেবে সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী রুকমীলা জামান, আরামিট সিমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল আজীজ এবং আরামিট সিমেন্টের এজিএম একেএম মারুফের নাম রয়েছে। মামলায় আরামিট সিমেন্ট এবং ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার জন্য অর্থ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত কোনো কেনাবেচা না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে মোট ২৭টি ডিলের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে।

প্রথম মামলা : দুদক জানায়, ২০১৮ সালের ২০ মার্চ একটি  ইসলামী ব্যাংকের জুবিলি রোড শাখার গ্রাহক আরামিট সিমেন্টের আবেদনে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিল করা হয়। ওই ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। 

দ্বিতীয় মামলা : ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরামিট সিমেন্টের আবেদনে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কামালবাজার শাখায় ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ১৭টি ডিল করা হয়। এর মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তৃতীয় মামলা : ২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৯টি ডিল করা হয়। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সদরঘাট শাখার ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে এসব ডিল করা হয়। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের ৪ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিজস্ব অংশ বাদ দিয়ে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তিন মামলায় টাকা আত্মসাতের পরিমাণ ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

দুদকের অভিযোগ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী হিসেবে সাইফুজ্জামান ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংকঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছিলেন। ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য না হয়েও তিনি পর্ষদের সভায় অংশ নিতেন এবং সিদ্ধান্ত দিতেন। আরামিট গ্রুপের কর্মচারীকে ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী দেখিয়ে ডিল অনুমোদন হয়েছে। আরামিট গ্রুপের এজিএম ও সাইফুজ্জামানের ব্যক্তিগত সহকারী মো. আব্দুল আজীজকে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তার প্রতিষ্ঠানকে সিমেন্টের কাঁচামালের সরবরাহকারী দেখিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ডিল অনুমোদনের জন্য নথি তৈরি করা হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে মালামাল সরবরাহ হয়নি।

এ ছাড়া ব্যাংক থেকে তোলা অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এর একটি অংশ নগদে তোলা হয় এবং কিছু অর্থ আগের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়। টাকার একটি অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করা হয়। আর সেই অর্থ দিয়ে সেখানে সম্পদ কেনা হয়। সেখান থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ কেনা হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পণ্য সরবরাহ হয়েছে কি না, যথাযথভাবে যাচাই না করে তারা অফিস নোট, পে-অর্ডার ও বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করেছেন।