ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় আসামি সোনাগাজীর কামরুন নাহার মনি (১৯) ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল যখন গ্রেপ্তার হন তখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিলেন। মামলার বিচার কাজ শুরু হলে তিনি প্রতি কার্যদিবসে আদালতে হাজির হন। তার আইনজীবী কয়েকবার জামিন চাইলেও আদালত নামঞ্জুর করেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকার কারণে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারকাজে অংশ নেওয়ার আবেদন জানালে আদালত সেটাও নামঞ্জুর করেন।
২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে রাত সাড়ে ১২টায় মনির কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। নাম রাখেন মোবাস্বেরা খানম রাথি। ডাকনাম ‘রোজা’। ২৪ অক্টোবর ফেনী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামির সঙ্গে মনিকেও মৃত্যুদ- দেন।
এক মাসের কম বয়সী দুগ্ধপোষ্য কন্যাশিশুকে নিয়ে মনি কারাবাসে যান। মনি এখন গাজীপুর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে (কনডেম সেল) বন্দি। এর মধ্যে পার হয়েছে ছয় বছরের বেশি সময়। এই ছয় বছর ফাঁসির সেলে তার সঙ্গে রয়েছে শিশুটি। ইতিমধ্যে স্বামী রাসেদুল আলম রাজুর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে মনির। পরিবার, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুটি মায়ের সঙ্গে বড় হচ্ছে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে।
বাংলাদেশ কারাবিধির (বাংলাদেশ জেল কোড) ৯৫৭ বিধি অনুযায়ী, নারী হাজতি ও কয়েদিরা চার বছর পর্যন্ত তাদের সন্তানদের কাছে রাখতে পারেন। তবে, আইনে বলা আছে, কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ছয় বছর পর্যন্ত সন্তানদের কাছে রাখার সুযোগ মেলে। কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শিশুর বয়স ছয় বছর পার হলে এবং মা কারাগারে থাকলে যে শিশুর স্বজনরা তাদের নিতে চান তাদের স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়। আর যেসব শিশুর স্বজন থাকে না তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পাঠানো হয় সরকারি শিশুনিবাসে। কিন্তু মনি তার সন্তানকে কিছুতেই নিজ থেকে আলাদা করতে চাননি।
কামরুন নাহার মনির মা নুর নাহার (৫৫) বলেন, পারিবারিক সম্পদ যা ছিল তা মামলার খরচে প্রায় শেষ। এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে সুদে টাকা ধার করে মামলা চালাচ্ছেন। নাতনির জন্য কিছুই রাখতে পারেননি। অর্থাভাবে তাকে নিয়মিত দেখতে যেতেও পারেন না। সবশেষ নাতনিকে দেখে গিয়েছেন গত ঈদুল ফিতরের পরের দিন (২২ মার্চ)। তিনি বলেন, ‘বাইরের পরিবেশটা কি নাতনি এখনো জানে না। ওখানে মা আছে। আরেকজন আসামিকে (তিনিও ফাঁসির আসামি) ‘ছোট মা’ ডাকে। তারাই আদর-যতœ করে। কিন্তু পোলাপানের মন কী আর মানে! জেলেও কষ্ট করছে, বাইরে এলেও কষ্ট করবে।’ তিনি বলেন, একমাত্র কন্যাই এখন মনির সম্ভল। কিছুতেই মেয়েকে হারাতে চান না মনি।
গত সোমবার দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছে আদালত। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মণি।
নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে কামরুন নাহার মণি খালাস পাওয়ার পর ওই দিনই মেয়ে মোবাস্বেরা খানম রাথিকে নিয়ে ফেসবুকে এক আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন রাশেদুল আলম খান। ‘বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম মা’ শিরোনামে সাত বছর বয়সী মেয়েকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা, কারাগারের জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা, দূরত্বের কারণে মেয়ের কাছে অপরিচিত হওয়ার আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিন পর মেয়ের সামনে দাঁড়ানোর উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তিনি লিখেছেন, ‘এই সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ রাথির ৭ বছর পূর্ণ হবে। তাকে ছাড়া ১৪টা ঈদ, ৭টা জন্মদিন আমি পার করেছি। কী নিষ্ঠুর বাবা আমি। মেয়েটার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। আমার প্রতিটা মুহূর্তের এক আল্লাহ সাক্ষী আছেন। জানি না আমাকে চিনবে কি না রাথী, জানি না আমি কীভাবে তার সামনে দাঁড়াব। অস্থির অস্থির লাগছে আমার।’
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদ- দেন। এরপর আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন। রায়ে তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।