কাঁদছে নেপাল। হিমালয় থেকে নেমে আসা ভোটেকোশি নদীর আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বানে ভেসে যাওয়া মানুষের মৃতদেহ বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আর এগুলো সংরক্ষণ ও শনাক্তের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল কর্তৃপক্ষের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবারের বন্যায় রাসুয়া ও নুয়াকোট এলাকা থেকে ভেসে আসা মৃতদেহগুলো নুয়াকোট ছাড়াও ভাটির দিকের চিতওয়ান, তানাহুন, নাওয়ালপরাসি ও অন্য এলাকায় উদ্ধার করা হয়েছে। নুয়াকোট, ধাদিং ও নাওয়ালপরাসির মর্গে জায়গা ফুরিয়ে আসায় কিছু মৃতদেহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
পোখারার হাসপাতালগুলোও জানিয়েছে, বিভিন্ন জেলা থেকে মৃতদেহ আসতে থাকায় তাদের মর্গগুলো পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। উদ্ধার লাশের চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাওয়ায় চিতওয়ানের ভরতপুরে অস্থায়ী মৃতদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ভয়াবহ এ বন্যায় এখনো নিখোঁজ রয়েছে প্রায় ২০০০ জনের বেশি মানুষ।
দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলো থেকে উদ্ধার লাশের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। উজানে হিমবাহ ধসে প্লাবন ডাকা ভোতেকোশি নদীতে ভেসে আসা মৃতদেহগুলো ভাটির অনেক দূর পর্যন্ত উদ্ধার করা হচ্ছে। এমনকি কিছু লাশ ভারতের দিকেও ভেসে এসেছে।
কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, রসুয়া ও নুয়াকোট থেকে ভেসে আসা মরদেহ ভাটির চিতওয়ান, তানাহুন, নওয়ালপরাসি, গোর্খাসহ অন্যান্য জেলায় পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বেশ কয়েকটি এলাকার হাসপাতালের মর্গগুলোতে এখন লাশ রাখার ন্যূনতম জায়গা খালি নেই। খুব বেশি দিন লাশ সংরক্ষণ করে রাখার পরিষেবাও নেই সেখানে।
এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিতওয়ানে উদ্ধারকৃত মরদেহের সংখ্যা সেখানকার হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯
এনডিআরআরএমএ-এর বরাত দিয়ে বিবিসি লিখেছে, দুইদিনে তারা ৪ হাজার মানুষকে উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি বিদেশি নাগরিক। তবে এখনো অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৯।
দুটি হ্রদ পর্যবেক্ষণ করছেন কর্মকর্তারা
এনডিআরআরএমএ-এর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার নেপাল তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন যে এলাকায় হড়পা বানে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার উজান অঞ্চলে তৈরি হওয়া দুটি হ্রদ সতর্ক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, হ্রদ দুটির পানি পুরোপুরি নিষ্কাশিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন বন্যার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। কারণ শুক্রবার এরই মধ্যে একটি হ্রদ উপচে পড়া শুরু করেছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, উপগ্রহ থেকে নেওয়া ছবিতে হিমবাহ ধসের স্থানটির কাছাকাছি এই হ্রদ দুটি দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বুধবার হিমবাহ ধসে নদী ব্যবস্থায় পাথর, বরফ, কাদা এবং ধ্বংসাবশেষ এসে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। প্রাণ হারায় শত শত মানুষ।
বৃহস্পতিবার চীনের একটি উদ্ধারকারী দলের ড্রোনের ধারণ করা ভিডিওতে দুটি হ্রদের একটির তৈরি হওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে। ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি অববাহিকায় বিপুল পরিমাণ ঘোলা পানি জমা হচ্ছে।
নতুন স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, শুক্রবারের মধ্যে সেই হ্রদটি থেকে পানি বের হতে বা নিষ্কাশিত হতে শুরু করে।
স্যাটেলাইট চিত্রে উজান অঞ্চলে আরেকটি হ্রদও দেখা গেছে, যা আকারে ক্রমশ বড় হচ্ছে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এটির ব্যাস প্রথম হ্রদের চেয়েও বড় ছিল। কিন্তু সেখান থেকে পানি বের হওয়ার মত কোনো পথ ছিল না। অর্থাৎ সেখানে এখনো পানির চাপ সৃষ্টি হচ্ছে; যে কোনো সময় তা উপচে পড়তে পারে।
অন্যদিকে বিবিসির খবরে বলা হয়, নেপালে আরও দুটি হিমবাহ পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছেন আবহাওয়াবিদরা। বিশেষ করে বুধবার যে হিমবাহটি ধসে বিধ্বংসী বন্যার সৃষ্টি হয়, সেটির কাছে থাকা আরও দুটি হিমবাহ এখন তারা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছেন। কারণ স্যাটেলাইট চিত্রে এমন কিছু ছবি পাওয়া গেছে; যা থেকে মনে হচ্ছে ওই হিমবাহগুলোতে ফাটল ধরেছে।
তবে নেপালের জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ফাটল থাকা মানেই যে হিমবাহগুলো ধসে পড়ার লক্ষণ, এমন নাও হতে পারে। এগুলো হয়ত এমন কোনো ফাটল যা হিমবাহগুলোতে অনেক আগে থেকেই ছিল। তারপরও সেগুলোকে নজরে রাখা হচ্ছে।
ভোতে কোশিতে ফের পানি বৃদ্ধি, সতর্কতা জারি
নেপালের রসুয়া অঞ্চলের ভোতে কোশি নদীতে আবারও পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাটি অঞ্চলের জন্য সতর্কতা জারি করেছে এনডিআরআরএমএ।
সংস্থাটির বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়, বুধবারের হড়পা বানে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ বয়ে আনা নদীটির পানির স্তর বেড়ে যাওয়ায় ফের বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে।
৯৩ হাজার মানুষের জরুরি ত্রাণের প্রয়োজন
শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, হিমালয় অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় ৯০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে রেড ক্রস।
সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলা এবং চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের জিরোং কাউন্টি।
সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় এক সংবাদ সম্মেলনে নেপালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের প্রতিনিধি প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, “আমরা মনে করি নেপালে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের জরুরি সহায়তার চরম প্রয়োজন।”
স্বজনদের ফিরে আসার প্রার্থনা
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে লোকনাথ চৌলাগাইন তার ২৩ বছর বয়সী ভাগ্নে সুদর্শনকে খুঁজছিলেন।
লোকনাথ আল জাজিরাকে জানান, বাস চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করা সুদর্শন বুধবার হড়পা বানের সময় তিব্বত সীমান্তবর্তী শহর তিমুরের চেকপয়েন্টে অপেক্ষা করছিলেন। বন্যা আঘাত হানার পর স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৫৪ মিনিটে তার নম্বরে একটি ফোন আসে, কিন্তু সুদর্শন ফোনটি ধরেননি। তারপর থেকে তাকে ফোনে আর পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারটি বন্যা কবলিত এলাকার কাছাকাছি এবং এখন কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে সুদর্শনকে খুঁজছে।
শুধু সুদর্শন নয়, এমন আরও শত শত মানুষের খোঁজে হাসপাতালগুলোতে ভিড় করেছে বহু পরিবার। তারা আশা করছেন, অলৌকিকভাবে হলেও হয়ত তারা ফিরে আসবে।