বন্দরের সঙ্গে বদলাবে বাণিজ্য গতিপথ

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা যত দ্রুত ঘুরছে, সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো কতটা এগোতে পারছে সেই প্রশ্ন কেবল বন্দরসংশ্লিষ্টদের নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মৌলিক প্রশ্ন। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি পণ্য কত দ্রুত বন্দরে আসবে, খালাস হবে এবং কত কম ব্যয়ে বাজারে পৌঁছাবে তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা। লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে, এপিএম গ্লোবালের বিনিয়োগ উদ্যোগকে শুধু অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য সূচনা। প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের কিছু সীমাবদ্ধতা কাটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন গতি তৈরি হতে পারে।

বন্দর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো সময়। বন্দরে জাহাজ কতক্ষণ অবস্থান করছে, একটি কনটেইনার খালাস হতে কত সময় লাগছে, পণ্য বন্দর থেকে বের হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে ব্যবসার খরচ। একটি জাহাজের অপ্রয়োজনীয় এক দিনের বিলম্ব শিপিং ব্যয় বাড়ায়। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ, শেষ পর্যন্ত বহন করেন আমদানি-রপ্তানিকারক ও ভোক্তা। এখানেই একটি আধুনিক টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। বিশ^মানের প্রযুক্তি, আধুনিক ক্রেন ও হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় অপারেশন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালিত হলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমানো এবং কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এর সুফল আসবে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক টার্মিনাল কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে, বন্দর খাতে একটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক

বাস্তবতা তৈরি হবে। এই প্রতিযোগিতাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বরং সঠিক নীতিমালার অধীনে সুস্থ প্রতিযোগিতা বন্দরের সেবার মান বাড়াতে পারে। কে দ্রুত সেবা দেবে, কে কম সময়ে জাহাজ ছাড়বে, কে দক্ষতার সঙ্গে কনটেইনার পরিচালনা করবে, কে ব্যবহারকারীদের জন্য অধিক নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করবে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।

এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হওয়ার কথা বন্দর ব্যবহারকারী, আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিপিং কোম্পানিগুলোর। কিন্তু একটি সতর্কতার জায়গা আছে। প্রতিযোগিতা যেন কোনোভাবেই অসম প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। ট্যারিফ, সেবার মান, অপারেশনাল নিয়ম, কাস্টমস ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একটি টার্মিনালকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া লক্ষ্য হতে পারে না। লক্ষ্য হতে হবে, বন্দরব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি। জাহাজ পরিচালনা, নেভিগেশন, নাব্যতা, সড়ক যোগাযোগ, নৌপথ, কাস্টমস, পণ্য ডেলিভারি এবং জাতীয় লজিস্টিকস পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। লালদিয়া প্রকল্পের সঙ্গে সমান্তরালভাবে লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম আধুনিক করতে হবে। পেপারলেস ট্রেড, স্বয়ংক্রিয় ও ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস ব্যবস্থা, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, দ্রুত পণ্য খালাস, স্মার্ট গেট ব্যবস্থাপনা, কনটেইনার ট্র্যাকিং এবং সড়ক-নৌ-রেল যোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়ন এখন বিলাসিতা নয়, এগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকার পূর্বশর্ত।

এপিএম গ্লোবালের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। এটি শুধু একটি টার্মিনালে বিদেশি বিনিয়োগ নয়, এর সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক বার্তাও যুক্ত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, নীতির স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। আধুনিক টার্মিনাল অবকাঠামো, ভবিষ্যতে জাহাজ পরিচালনা ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি করতে পারে। নাব্যতা ও জাহাজ চলাচলের বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে আবেগ নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি ড্রেজিং পরিকল্পনা এবং আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন। ভবিষ্যতের বন্দর শুধু দ্রুত ও লাভজনক হলে হবে না, তাকে পরিবেশবান্ধব হতে হবে। বিদ্যুৎচালিত হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, জ্বালানি দক্ষতা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আন্তর্জাতিক গ্রিন-পোর্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা গেলে, লালদিয়া টার্মিনাল বাংলাদেশের বন্দর খাতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, লালদিয়া টার্মিনালকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে, দেশের বন্দর সংস্কারের বৃহত্তর যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কম সময়ে জাহাজ খালাস, কম খরচে পণ্য পরিবহন, দ্রুত কাস্টমস, নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিকস এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা। আমাদের বন্দর খাত এখন এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরনো পদ্ধতি ধরে রেখে নতুন বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন। লালদিয়া টার্মিনাল সেই পরিবর্তনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে শুধু টার্মিনাল কত আধুনিক হলো তার ওপর নয়, বরং আমরা এর সঙ্গে পুরো বন্দর, কাস্টমস ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে কতটা আধুনিক ও সমন্বিত করতে পারলাম তার ওপর। সুতরাং লালদিয়া টার্মিনালকে শুধু একটি নতুন টার্মিনাল হিসেবে নয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি, ব্যয় ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। সুস্থ প্রতিযোগিতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে লালদিয়া শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে আরেকটি টার্মিনাল হবে না, এটি বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

লেখক : সাবেক পরিচালক

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

mta.suzan@gmail.com