ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে হাইকোর্টে আপিলে খালাসের আদেশ পেয়ে গাজীপুর কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন কামরুন নাহার মনি। তার সঙ্গে বেরিয়ে আসেন কারাগারের অভ্যন্তরে জন্ম নেওয়া কন্যাসন্তান মোবাস্বেরা খানম রাথি।
কারাগার থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ সাত বছরের কষ্টের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতে থাকেন। এ সময় বলেন, কন্যা রোজা (রাথি)কে মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে খেলতে দিতাম। বালিশকে স্কুলব্যাগ বানিয়ে পড়ালেখা করাতাম। একজন মা হিসেবে আমার ও মেয়ের কষ্ট কেউ বুঝবে না। বাবা কখনো মায়ের মতো সন্তানকে যত্ন করে রাখতে পারে না। আমি তাকে নিয়ে আগামী জীবন থাকতে চাই।
তিনি আরও বলেন, যারা আমাদের অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে ফাঁসির আসামি করেছে, আমরা তাদের বিচার চাই।
নুসরাত হত্যা মামলায় আসামি কামরুন নাহার মনি ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল গ্রেপ্তার হন। যখন গ্রেপ্তার হন, তখন তিনি পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিলেন। মামলার বিচারকাজ শুরু হলে মনিকে প্রতি কার্যদিবসে আদালতে হাজির করা হয়। তার আইনজীবী কয়েকবার জামিন চাইলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকার কারণে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারকাজে অংশ নেওয়ার আবেদন জানালে আদালত সেটাও নামঞ্জুর করেন।
২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে রাত সাড়ে ১২টায় মনির কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। নাম রাখেন মোবাস্বেরা খানম রাথি। যদিও মনি তার মেয়েকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন বলে জানা গেছে। সেদিন নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায় শুধু নিজেই শোনেননি, রায় শুনেছেন কোলে থাকা তার এক মাস বয়সী নবজাতকও।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ৩৪২ ধারায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়ার সময় কামরুন নাহার মনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে পিবিআই হেফাজতে তাকে চরম নির্যাতন ও পেটে লাথি মেরে বাচ্চা নষ্ট করার হুমকি দিয়ে জবানবন্দি আদায়ের অভিযোগ করেন। কিছুতেই কাজ হয়নি। ফাঁসির দণ্ড নিয়ে গাজীপুর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে বন্দি হয়ে অধস্তন আদালতের রায়ের পর ছয় বছরের বেশি সময় পার করছেন।
হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফাঁসির রায় হয় ফেনীর সোনাগাজীর কামরুন নাহার মনির (তখন তার বয়স ১৯ বছর)। এক মাসের কম বয়সী দুগ্ধপোষ্য কন্যাশিশুকে নিয়ে তিনি কারাবাসে যান। মনি এখন গাজীপুর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে (প্রচলিত ভাষায় কনডেম সেল) বন্দি। অধস্তন আদালতের রায়ের ছয় বছরের বেশি সময় পার হলেও তার মামলাটি হাইকোর্টে অবশেষে নিষ্পত্তি হয়। ছয় বছর ফাঁসির সেলে তার সঙ্গে রয়েছে শিশুটি। ইতিমধ্যে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে মনির। পরিবার, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুটি মায়ের সঙ্গে বড় হচ্ছে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে।
বাংলাদেশ কারাবিধির (বাংলাদেশ জেল কোড) ৯৫৭ বিধি অনুযায়ী, নারী হাজতি ও কয়েদিরা চার বছর পর্যন্ত তাদের সন্তানদের কাছে রাখতে পারেন। তবে আইনে বলা আছে, কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ছয় বছর পর্যন্ত সন্তানদের কাছে রাখার সুযোগ মেলে।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শিশুর বয়স ছয় বছর পার হলে এবং মা কারাগারে থাকলে যে শিশুর স্বজনরা তাদের নিতে চান, তাদের স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়। আর যেসব শিশুর স্বজন থাকে না, তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পাঠানো হয় সরকারি শিশুনিবাসে। কিন্তু মনি তার সন্তানকে কিছুতেই নিজ থেকে আলাদা করতে চাননি। তাই তো স্বামী রাসেদুল আলম রাজুর সঙ্গে হয় মনোমালিন্য। একপর্যায়ে রূপ নেয় বিচ্ছেদে।
কামরুন নাহার মনির মা (শিশুটির নানি) নুর নাহার (৫৫) বলেন, পারিবারিক সম্পদ যা ছিল, তা মামলার খরচে প্রায় শেষ। এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে সুদে টাকা ধার করে মামলা চালাচ্ছেন। নাতনির জন্য কিছুই রাখতে পারেননি। অর্থাভাবে তাকে নিয়মিত দেখতেও যেতে পারতেন না।
সবশেষ নাতনিকে দেখে গিয়েছেন গত ঈদুল ফিতরের পরের দিন (২২ মার্চ)। তিনি বলেন, ‘বাইরের পরিবেশটা কি নাতনি এখনো জানে না। ওখানে মা আছে। আরেকজন আসামিকে (তিনিও ফাঁসির আসামি) ‘ছোট মা’ ডাকে। তারাই আদর-যত্ন করে। কিন্তু পোলাপানের মন কি আর মানে! জেলেও কষ্ট করছে, বাইরে এলেও কষ্ট করবে।’ তিনি বলেন, একমাত্র কন্যাই এখন তার সম্বল। কিছুতেই মেয়েকে হারাতে চান না মনি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মনি।
এদিকে নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে দীর্ঘ কারাবাসের সময়ে এমন কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন আসামি কামরুন নাহার মনির সাবেক স্বামী রাশেদুল আলম খান। ‘বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম মা’—সাত বছর বয়সী মেয়েকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা, কারাগারের জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা, দূরত্বের কারণে মেয়ের কাছে অপরিচিত হওয়ার আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিন পর মেয়ের সামনে দাঁড়ানোর উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এ স্ট্যাটাস দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ। রায়ে তৎকালীন মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।