বিকল্পটা একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মতাদর্শিক। এর জন্য দরকার পড়বে সামাজিক বিপ্লবের। প্রত্যেকটি দেশেই। যেটা স্থানীয়ভাবে গড়ে তোলা চাই, তবে তার চরিত্রটা অবশ্যই থাকবে আন্তর্জাতিক। পুঁজিবাদ যেমন আন্তর্জাতিক, তার বিকল্পও হওয়া দরকার তার চেয়েও গভীরভাবে আন্তর্জাতিক। সমাজ বিপ্লবের জন্য খুব বেশি করে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক অনুশীলনের ও প্রস্তুতির। সাহিত্য, সংগীত, খেলাধুলা, আলোচনা-বিতর্ক, নাটক, নৃত্য, প্রচারমাধ্যম সবকিছুর মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক কাজটা এগিয়ে নেওয়া আবশ্যক। পুঁজিবাদ ওই কাজটাকেই বিশেষ রকমের কঠিন করে তুলেছে। বৈশ্বিক এই আদর্শের কাছে সবকিছুরই ওজন হয় মুনাফার বাটখারার।
সংস্কৃতির চর্চাকেও সে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করতে তুমুলভাবে আগ্রহী। স্পর্শমাত্র পণ্যে পরিণত করবার ক্ষমতা সে রাখেও। সংস্কৃতির বাণিজ্যিক চর্চার বিপক্ষে, এবং মানবিক চর্চার পক্ষে আজ দাঁড়ানো চাই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংস্কৃতির মানবিক চর্চারই অপর নাম সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা।
পুঁজিবাদ মনেপ্রাণে সংস্কৃতির এই চর্চার বিরোধী। সংস্কৃতিচর্চা বিনোদন সরবরাহ করবে, এটা ঠিক আছে। অশ্লীল হলে তো আরও ভালো। তাতে বাণিজ্য জমবে, এবং তারচেয়েও বড় একটা প্রাপ্তি ঘটবে, সেটা হলো মানুষকে সামাজিক বিপ্লববিরোধী করা যাবে। বিপ্লববিরোধিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার চমৎকার নিদর্শন এখন পাওয়া যাচ্ছে সর্বাধিক উন্নত-বলে-কথিত আমেরিকায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শ্বেতশ্রেষ্ঠত্ববাদী উন্মত্ততা এমন পর্যায়ে উঠেছে যে ভিন্ন বর্ণের মানুষদের বিতাড়ন ইতিমধ্যে শুরু করেছে। এবং ওই বর্ণশ্রেষ্ঠত্ববাদীরা নির্বাচনে তাদের প্রার্থী ট্রাম্পকেই জিতিয়েছেন। পুঁজিবাদ গভীর ধরনের সাহিত্যের চর্চাও একেবারেই পছন্দ করে না। সে জন্য দেখছি পাঠককে যে-সাহিত্য ধাক্কা দেয়, চিন্তিত করে, বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে, তার প্রচার নেই, বাজারও নেই। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি অত্যন্ত সম্মানজনক ঘটনা। সে পুরস্কার দেওয়া হলো বব ডিলানকে, যিনি উঁচুমানের একজন সংগীতরচয়িতা ও সংগীতশিল্পী অবশ্যই, কিন্তু নিজেকে যিনি সাহিত্যিক বলে মনে করেন না, যে জন্য পুরস্কার গ্রহণে তার রীতিমতো দ্বিধা ছিল। এর পরে এক বছর তো পুরস্কার দেওয়াই হলো না, দাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভেতর বিরোধের কারণে। বাংলাদেশও যে ওই পুঁজিবাদী ব্যাধিতে আক্রান্ত তারও প্রমাণ মেলে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার সময় সাহিত্যশাখার জন্য এমন সব লোককে মনোনীত করা হয় যাদের রচনা পড়া তো দূরের কথা নামও লোকে শোনেনি। এর পেছনে ক্ষমতাসীনদের এবং আমলাতন্ত্রের তৎপরতা রয়েছে। তা অন্তরালে যাই থাকুক, সামনে থেকে তো বোঝা যাচ্ছে সাহিত্যচর্চা তার আগের, এবং সর্বকালের, গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের একুশের বইমেলাও তো দেখছি সাহিত্যেমেলার চরিত্র ছেড়ে বিপরীত রূপ নিতে চাচ্ছে।
কিন্তু সাহিত্য তো থাকবে। এই পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে ঠিক ততদিন সাহিত্যও থাকবে। কারণ সাহিত্য মানুষের মনুষ্যত্বকে ধারণ ও লালন করে। কিন্তু সে জন্য সাহিত্যকে গভীর হতে হবে, মন ভুলানোর ছলাকলা-নির্ভর হলে চলবে না। যাকে আধুনিক যুগ বলা হয় সে-কালে আওয়াজ উঠেছে ‘আনন্দের সাহিত্য চাই’, কেউ-বা আবার ঘোষণাই দিয়েছেন, সহেনা সহেনা প্রাণে জনতার জঘন্য মিতালী। উদারনীতিক যিনি তিনি বলেছেন অদৃশ্য কোনো একটা শক্তি নিশ্চয়ই আছেন যিনি মেলাবেন ঝড়ো হাওয়াটায় ও পোড়ো বাড়িটায়। মার্কসবাদে বিশ্বাসী কবিও চেষ্টা করেছেন বিপ্লবী মার্কসের সঙ্গে ঘোরতর রক্ষণশীল টিএস এলিয়টের মিলন ঘটাবার। এসব কাজ সাহিত্যকে গভীরতা দেয়নি, এমনকি সাহিত্যের গুরুত্বকে যে দৃশ্যমান করবে সে কাজটাও করতে পারেনি। সুবিধা হয়েছে পুঁজিবাদী সংস্কৃতির চর্চার। এটা বোধকরি মানতেই হবে যে, বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিতে এক ধরনের বিষণœতা রয়েছে। গাছপালা, নদ-নদী, অর্থনীতির কৃষিনির্ভরতা, বহুকালের খাদ্যাভ্যাস, সবকিছুই নরম ধরনের। মাংসের চেয়ে মাছ ও শাকসবজি এখানকার মানুষের অধিক পছন্দ। তারা স্বল্পে সন্তুষ্ট। ঝামেলায় জড়াতে চায় না। বাংলাদেশের মানুষ হিংস্র হতে যে জানে না এমন নয়। বিশেষ করে যখন দলবদ্ধ হয়, এবং ভাবে শত্রুকে পেয়ে গেছে একেবারে হাতের মুঠোতে, তখন। কিন্তু সাধারণত নরম-সরম। ছোট ছোট ঘটনাতে সেটা ধরা পড়ে। যেমন এই ঘটনাটা, সব কাগজে আসেনি, বড় কাগজে ছোটভাবে এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাতে একজন ভারতীয় ধরা পড়েছে, গরু চুরি করে সে ভারতে নিয়ে যাচ্ছিল। একেবারে হাতেনাতে ধৃত। গ্রামবাসী কিন্তু তাকে কোনো ‘শাস্তি’ দেয়নি। স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে মাত্র। গরু চুরির এই ঘটনা যদি, ধরা যাক, আসামে ঘটত; আর লোকটি যদি বাংলাদেশি হতো, ব্যাপারটা তাহলে কী রকম দাঁড়াত? গরু চোরকে অবশ্যই গ্রামবাসী পিটিয়ে মেরে ফেলত। চোর হওয়া দরকার পড়ত না, সন্দেহই যথেষ্ট হতো। আর কিশোরী ফেলানীকে মেরে সীমান্তের তারের বেড়াতে ঝুলিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে সমর্থন পেত বলে আমরা মনে করি না।
আমাদের সমাজ অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক, ভীষণভাবে পিতৃতান্ত্রিক; কিন্তু সংস্কৃতিতে মাতার ভূমিকা থাকে, সেটা যত অপ্রত্যক্ষ ততই কার্যকর, শিরা-উপশিরার মতো। ঘরগেরস্থালির নিত্যদিনের পরিচালনা ও সন্তানের লালনপালনের মাধ্যমে এবং আহার প্রস্তুত ও পরিবেশনার ভেতরে মা আছেন। মা থাকেন। সবকিছুতে স্নেহের মিশ্রণ ঘটিয়ে। মা নিজে কিন্তু বিষন্নই থাকেন। বাধ্য হন থাকতে। ওদিকে সংস্কৃতিতে আবার ভয়ও কাজ করে। সুদীর্ঘকালের পরাধীনতা মানুষকে দরিদ্র করে রেখেছে। এদেশে সম্পদ কখনোই কম ছিল না; শ্রম দিয়ে মানুষ উৎপাদনও করেছে, কিন্তু এখানকার সম্পদ পাচার হয়ে গেছে, বিদেশে। ভূমি উর্বর। ফসল ফলে সহজে। কিন্তু সে-ফসল উৎপাদনকারীরা পায় না। লুণ্ঠিত হয়ে যায়। আবার বন্যা এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনেক কিছু। ভয়টা কাটে না। সংস্কৃতির বিশেষ উপাদান শিক্ষা। সেই শিক্ষাতেও ওই ভয়টা নিয়মিত শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। বাল্যশিক্ষার বইতে আমরা একেবারে প্রথমেই পড়েছি ‘অ’তে অজগর আসছে তেড়ে। এখন হয়তো বর্ণপরিচয়ের বইতে ‘অ’ বর্ণের ওই পরিচয়টি নেই; কিন্তু সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা জুড়েই ভয়টা ব্যাপ্ত রয়ে গেছে। ভয় ফেল করবার। ফেল করলে শাস্তি পাওয়ার। ভয়ের উল্টোপিঠে থাকে লোভ। বর্ণপরিচয়ে ‘আ’তে ছিল, ‘আমটি আমি খাব পেড়ে।’ আমগাছটি আমি লাগাইনি, আমের ফলনে আমার কোনো শ্রম নেই; কিন্তু গাছে যেহেতু সেটি ঝুলছে, তাই আমি সেটি পেড়ে নেব, খেয়ে ফেলব, কাউকে দেব না। কী পুঁজিবাদী কী সামন্তবাদী, সব ব্যবস্থাতেই ভীতি ও প্রলোভনের এই দ্বৈত শিক্ষাটা অনবরত দেওয়া হচ্ছে। দারিদ্র্য, ভীতি ও লোভ (যা পূরণ হয় না), এরা মিলে বিষন্নতা বাড়িয়ে তোলে মাতার বিষন্নতা।
বাঙালির, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের বাঙালির এই বিষন্নতা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে জীবনানন্দ দাশের কবিতাতে। এই বিষন্নতার অন্তরে রয়েছে গভীর বেদনা, দুর্ভার হতাশা। কিন্তু বাঙালির ভেতর আবার বিদ্রোহও আছে। আসলে বেদনা ও বিদ্রোহ দুটো মিলিয়েই বাঙালির সংস্কৃতি। বেদনা ও বিদ্রোহের ভেতরকার সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক; এতে কোনো পক্ষই জয়ী হয় না, তবে বৃদ্ধি পায় বিষন্নতা। জীবনানন্দ দাশ যেমন বেদনাকে মূর্ত করেছেন, তেমনি তারই সমসাময়িক কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যও ওই বিদ্রোহের, তথা বিপ্লবের যে আকাক্সক্ষা, তারই কবি। সময় জিনিসটা জীবনানন্দ ও সুকান্ত উভয়ের জন্যই সত্য। সময়কে বোঝাবার জন্য ঘড়ির রূপক দুজনেই ব্যবহার করেছেন। জীবনানন্দ দাশ তার কবিতা ‘ঘড়ির দুটি ছোট কালো হাত’ কবিতাতে বলছেন যে, ঘড়ির কাটা তাদের, তাকে ও তার প্রিয়তমাকে, নিয়ে যেতে চায় যেন ‘শব্দহীন মাটি ঘাসের দিকে’, যেখানে ‘সাহস সংকল্প প্রেম আমাদের কোনোদিন যাবে না’; তবু সেদিকেই যেতে হয়, ‘কী গভীর সহজ অভ্যাসে।’ অভ্যাসটা মৃত্যুর দিকে যাওয়ারই। কিন্তু সাহস সংকল্প প্রেম, এরা তো মিথ্যা নয়; তারা আছে, তারা মৃত্যুর দিকে যাবে না। আর ওই সাহস সংকল্প প্রেমই দেখি মুখর হয়ে উঠেছে সুকান্তের ‘বিদ্রোহের গান’ কবিতায় : ‘বেজে উঠল কি সময়ের ঘড়ি?/ এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি।’
বেদনা ও বিপদ এখন সারা পৃথিবীতে প্রধান সত্য। নানাবিধ বিষের ক্রিয়াতে মানুষ জর্জরিত। কিন্তু বেদনা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করছে না, মানুষ বিদ্রোহী হয়ে যে উঠবে তেমনটা ঘটছে না। বিপদের মধ্যে আরেক বিপদ, বড় বিপদই বলা যায়, ওইখানেই। যারা আস্থা রাখেন মানুষের ভবিষ্যতের ওপর এবং সে-কারণে মানুষের মানুষ্যত্বের ওপরই, তারা নিশ্চয়ই পরাভূত হবেন না। পৃথিবীটাকে বদলাবেন। তার জন্য প্রয়োজন হবে বেদনার্ত মানুষদের ঐক্য, আর সে-ঐক্য গড়ে তোলার জন্য অত্যাবশ্যক যা তা হলো সমাজ-রূপান্তরকামী সংস্কৃতির চর্চা। সাহিত্য তাতে খুব বড় একটা ভূমিকা রাখবে। সাহিত্যের মূল কাজটাই তো হলো সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংহতি গড়ে তোলা; পুঁজিবাদ যেটা চায় না। পুঁজিবাদের কাজ বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা। সাহিত্যও সংস্কৃতিরই অংশ; এবং সংস্কৃতির কাজও হচ্ছে ঐক্য সৃষ্টি। তবে সাহিত্যে যেমন, সংস্কৃতিতেও তেমনি, প্রতিক্রিয়াশীলতা কার্যকর থাকে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবিদ্বেষ, নারী-পুরুষে বৈষম্য, উগ্র জাতীয়তাবাদ, এ সবের লালনপালন প্রতিক্রিয়াশীলতার তৎপরতারই অংশ। নতুন সমাজ ও সংস্কৃতি গড়বার জন্য তাই প্রয়োজন সামাজিক বিপ্লবের।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়