হুতিদের থামাতে ইরানকে চীনের তাগিদ

লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিতে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায়, সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানি এবং সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে একদিকে যেমন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তেমনি বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছে রিয়াদ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করার জন্য ইরানকে তাগিদ দিয়েছে চীন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি ইরানি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

তবে বার্তাটি ঠিক কীভাবে তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য দেয়নি। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফরের সময় বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের এই বার্তার জবাবে তেহরান বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ না হলে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরবে না। তিন ইরানি সূত্র জানায়, চীনা কর্মকর্তারা তেহরানকে সরাসরি কোনো হুমকি দেননি। হুতিদের ওপর প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দেওয়া হবেÑ এমন কোনো ইঙ্গিতও বেইজিং দেয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ ও নৌপথে নিরাপদ চলাচল ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে তেহরানকে একান্তে দেওয়া বার্তায় এর চেয়ে আরও বেশি কিছু বলা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, তেহরানের পক্ষ থেকে জবাবে বলা হয়েছেÑ এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে ইরানের যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ওপর।

রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চীন চায় না আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে পৌঁছাক। আঞ্চলিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়। বেইজিং আরও জানায়, ‘সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা উচিত এবং মানুষের জীবনযাত্রার জন্য অপরিহার্য স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো যাবে না। চীন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এমন পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে এবং আলোচনা ও সংলাপে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিচ্ছে।’ তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতাও চীন। পণ্যবাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল দিনে গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। এ বিষয়ে অঞ্চলটিতে দায়িত্বরত এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, হুতিদের লাগাম টানতে ইরানের ওপর চাপ দিতে পারে, বিশ্বে এমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে এই হাতেগোনা দেশগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম।

একটি সূত্র বলেছে, ইরান ও তার মিত্ররা এখন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দুই প্রান্তেই চাপ সৃষ্টি করছে। আর চীন দুটি নৌপথের ওপরই নির্ভরশীল। ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, বেইজিং হয়তো ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের বিরোধিতা করবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ ইরানের বাইরেও বিস্তৃত। চীনের তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে এ অঞ্চল থেকে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার।

ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেইজিংয়ের উদ্বেগের বিষয়ে তেহরান কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সূত্রগুলো এও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে থাকা ইরানের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি ইরানি সূত্র বলেছে, তেহরানের কাছে বেইজিংয়ের স্বার্থ অনেকগুলো বিবেচনার মধ্যে একটি মাত্র। ইরানের সিদ্ধান্ত কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। পশ্চিমা সেই কূটনীতিক বলেন, তেহরান ও বেইজিংয়ের একে অপরকে প্রয়োজন। চীন এমন একটি পক্ষ, যাকে তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না। আর বেইজিং চায়, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হোক, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিরাপদ থাকুক।