প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে, একই সময়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে স্থানীয় মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে। মূলত গ্রামে-গঞ্জে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন বা কেজি স্কুলই প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

এ বিষয়ে মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। ফলে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা কিন্ডারগার্টেনের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে, তুলনামূলক খরচ কম এবং ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ থাকায় দরিদ্র অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এছাড়া শিক্ষার উন্নয়নে কয়েক বছর আগেও বেশ কিছু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছে সরকার। শুধু তাই নয়, বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে বই বিতরণ করে উৎসব পালন করছে। সরকারিভাবে শিক্ষার্থীদের উপকরণ কেনা বাবদ দেওয়া হচ্ছে উপবৃত্তি। এছাড়াও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেওয়া হয়েছে সুসজ্জিত একাডেমিক ভবন। বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, ক্ষুদ্র মেরামত ও প্লে-শ্রেণির কক্ষ সজ্জিতকরণ এবং শিক্ষা উপকরণ কেনার পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রয়েছে একেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পাশাপাশি পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকও নিয়োগ রয়েছেন। এরপরও শিক্ষার্থী কমছে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

সূত্র জানায়, মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের অভাবের কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠাচ্ছেন না অভিভাবকরা। বেশি টাকা খরচ হলেও তারা সন্তানকে দিচ্ছেন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষা। যদিও ‘অভিভাবকদের কাক্সিক্ষত শিক্ষার’ উদ্দেশ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে সরকার।

এদিকে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো জবাবদিহি নেই। চাকরি স্থায়ী হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধের চেয়ে এক ধরনের উদাসীনতা বেশি কাজ করে, যা তাদের ক্লাসে অনিয়মিত করে তোলে। এমনকি নামমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতা (এসএসসি/এইচএসসি) নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করায় অনেকের মেধা ও যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই এসএসসি বা এইচএসসি পাস করেই ঢুকে পড়েছেন এ চাকরিতে। সেক্ষেত্রে দুর্বল মেধার একটা প্রশ্নও থেকে যায়। সবমিলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান দিনদিন কমে যাচ্ছে।

অভিভাবকরা বলছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় শিক্ষকরা পাঠদানকে স্রেফ চাকরি বাঁচানোর হাতিয়ার বানিয়েছেন। ফলে দিন দিন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকছে। এই দুরবস্থার কারণে সাধারণ অভিভাবকরা বাধ্য হয়েই বাড়তি অর্থ গুনে সন্তানদের কেজি স্কুলে পাঠাচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই করুণ যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা খোদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নিজেদের সন্তানদের এই সরকারি স্কুলে পড়াচ্ছেন না। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এখন ‘গরিবের সন্তানদের স্কুলে’ পরিণত হয়েছে।

এদিকে, প্রতি বছর ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন কেজি স্কুলের সংখ্যাও বাড়ছে আনোয়ারায়। এসব স্কুলের অনুমোদন না থাকলেও ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে নানা অফার দিয়ে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করছে। বহুমুখী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পোস্টার, লিফলেট, বিলবোর্ডসহ মাইকিং করে শিক্ষার্থী ভর্তি করে তারা। অবশ্য টাকা বেশি নিলেও শিক্ষা দেওয়ায় তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিকল্প বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এছাড়া এসব স্কুলে উপজেলা শিক্ষা অফিসকে বিভিন্ন কৌশলে ম্যানেজ করে সরবরাহও করা হচ্ছে সরকারি বই।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রদীপ চক্রবর্ত্তী বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রবণতা শুধু জনসংখ্যাতাত্ত্বিক কারণে নয়, বরং অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। জনসংখ্যা বাড়তে থাকলেও যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে থাকে তবে সরকারি স্কুলে ভর্তির এই পতন স্পষ্টভাবে অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।