সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও ঝরে পড়া রোধে সরকার গাইবান্ধায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়। বিদ্যালয়ে সপ্তাহে পাঁচদিন দুপুরের খাবার চালুর পর উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী বিদ্যালয়মুখী হয়েছে। পড়াশোনায় প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। পূর্বে যেখানে উপস্থিতির হার ছিল ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ, তা এখন বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে উন্নতি হয়েছে। এই কর্মসূচি বাকি পাঁচটি উপজেলায় চালুর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে গাইবান্ধা সদর ও পলাশবাড়ী উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। দুই উপজেলায় মোট ৪৩৮টি সরকারি বিদ্যালয়ে ৫৮ হাজার ৭৩৮ জন শিক্ষার্থী প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে। এরমধ্যে গাইবান্ধা সদরে ১৪টি ইউনিয়নের ২২২ টি বিদ্যালয়ের ৩৪ হাজার ৫৬৫ জন ও পলাশবাড়ীতে আটটি ইউনিয়নে ২১৬টি বিদ্যালয়ের ২৪ হাজার ১৭৩ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়মিত এই খাবারের সুবিধা পাচ্ছে। জেলায় মোট বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৪৬৫ টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং ঝরে পড়ার হার কমানো। এর আওতায় সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের বনরুটি, কলা, ডিম, দুধ ও পুষ্টিগুণ-সমৃদ্ধ বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দুই উপজেলার অন্তত ২০টি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায় শ্রেণি কক্ষের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সাথে কথা হয়।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মেঘডুমুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আমার বিদ্যালয়ে আগে শিক্ষার্থী ছিল ১৫০ জনের মতো। দুপুরে খাবার চালুর পর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০০ প্লাস ও উপস্থিতির হার বেশ ভালো।
মেঘডুমুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী লিশা আক্তার বলে, সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসতাম। এতে দুপুর হতেই ক্ষুধা আর ক্লান্ত লাগত। বিকেল চারটা পর্যন্ত ক্লাস করতে কষ্ট হতো। কিন্তু এখন নিয়মিত রুটি, কলা, ডিম, দুধ ও বিস্কুট পাচ্ছি। এখন পেট ভরা থাকে, তাই সব ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারি। এটি আমার কাছে খুবই ভালো লাগে।
একই বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়া আক্তার জানায়, প্রতিদিন স্কুলে আসলে খাবার পাওয়া যায়। বিদ্যালয়ে আসতে আমার খুব ভালো লাগে।
একই ক্লাসের কাব্য আকতার বলে, ডিম, দুধ, রুটি, কলা ও বিস্কুট খেতে বেশ ভালো লাগে। আমার রুটিটা বেশি পছন্দ। অনেক নরম ও পুষ্টি, খেলে পেট ভরে যায়।
পলাশবাড়ী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ সাফি বলে, স্কুল থেকে আমার বাড়িতে যেতে প্রায় ২০ মিনিট লাগে। আগে দুপুরের খাবারের জন্য বাড়িতে যেতাম। অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু এখন স্কুলেই খাবার দেয়।
জেলায় প্রকল্পটির কারিগরি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ইএসডিএফ)। সংস্থাটির স্কুল ফিডিং প্রকল্পের জেলা কোঅর্ডিনেটর আবু ওয়ালিদ বলেন, সরকারের এই প্রকল্পটিকে আমাদের সংস্থা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা মানসম্মত খাবার শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়মিত তদারকি করছি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার দাশ জানান, জেলার দুই উপজেলার পরীক্ষামূলক এই প্রকল্প চালু রয়েছে। গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ইতিবাচক। খাবারের তালিকায় বনরুটি, কলা ও ডিম যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা পূরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে এ কর্মসূচি। আগামী জানুয়ারি থেকে জেলার সব উপজেলায় এটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে।