সাইকেলে বীর কুমারের হিমালয় জয়

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেল চালিয়ে হিমালয়ের দুর্গম উচ্চতায়। একের পর এক পাড়ি দিয়েছেন নেপালের এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম পাস। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে গড়েছেন এক অনন্য কীর্তি। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইক্লিস্ট বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা এভারেস্ট অঞ্চলের কং মা লা, ছো লা ও রেনজো লা পাস জয় করে এই

কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। ‘সি টু হিমালয়াস-এক্সপেডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস’ শীর্ষক অভিযানে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা প্রথম বাংলাদেশি এবং প্রথম আদিবাসী সাইক্লিস্ট হিসেবে সাইকেল চালিয়ে এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি দুর্গম ও উচ্চতম পাসের চূড়ায় পৌঁছেছেন।

অভিযানের সর্বশেষ ধাপে গত ৫ অক্টোবর নেপালের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৬ মিনিটে পাঁচ হাজার ৩৬০ মিটার উচ্চতার রেনজো লা পাস জয় করেন বীর কুমার। এর আগে গত ১ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিটে পাঁচ হাজার ৪২০ মিটার উচ্চতার ছো লা পাস এবং ২১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে পাঁচ হাজার ৫৩৫ মিটার উচ্চতার কং মা লা পাস জয় করেন তিনি।

তিনটি পাসের মধ্যে কং মা লা ছিল সবচেয়ে উঁচু। দুর্গম পাহাড়ি পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র ঠা-া ও উচ্চতাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাইকেল নিয়ে এসব পাসের চূড়ায় পৌঁছান বীর কুমার। দীর্ঘ ও কঠিন এই অভিযানের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকাকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে।

অভিযানের শুরুতে গত ১৪ আগস্ট কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট থেকে সাইকেল নিয়ে স্থলপথে যাত্রা শুরু করেন বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান নেপালের হিমালয় অঞ্চলে। এরপর একে একে জয় করেন এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম পাস।

অভিযানের শেষ ধাপ সম্পন্ন করার পর গত মঙ্গলবার সকালে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, এই অর্জন শুধু তার একার নয়, তার পাশে থাকা প্রত্যেক মানুষের। মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাই তার পথচলার শক্তি। তিনি বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেল চালিয়ে হিমালয়ের উচ্চতায় পৌঁছানো এবং এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম পাস জয় করা তার জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের। পথটি সহজ ছিল না। তবে বাংলাদেশের পতাকা এবং নিজের এলাকার মানুষের ভালোবাসা প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তাকে সাহস জুগিয়েছে।

কাপ্তাইয়ের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে আসা বীর কুমারের সাইক্লিংয়ের প্রতি আগ্রহ দীর্ঘদিনের। দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও সাইকেল নিয়ে অভিযানে অংশ নিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তুলে ধরার স্বপ্ন থেকেই তার এ পথচলা। এবারের হিমালয় অভিযান সেই ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত তার অন্যতম বড় অর্জন।

অভিযানে সহযোগিতার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ও রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বীর কুমার। তিনি বলেন, দীপেন দেওয়ানের সার্বিক সহযোগিতা এবং তার কল্যাণে ভিসা পাওয়ায় এই অভিযানে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়েছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সহযোগিতা, উৎসাহ দিয়ে পাশে থাকা সবার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

বীর কুমারের কাছে এই অভিযান শুধু কোনো রেকর্ড বা ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়। তার লক্ষ্য সাইক্লিংয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি করা, পরিবেশ সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং তরুণদের ইতিবাচক ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক কর্মকা-ে উৎসাহিত করা। তার এই অর্জনে স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্ছ্বসিত ও গর্ববোধ করছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের একজন তরুণ কীভাবে নিজের স্বপ্ন, সাহস ও অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, বীর কুমারের এই অভিযান তারই উদাহরণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, হিমালয়ের দুর্গম তিন পাস জয় করে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার এই সাফল্য দেশের তরুণদের সাইক্লিং, পর্বতারোহণ ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক কার্যক্রমে আরও উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে তার এই যাত্রা দেশের ক্রীড়া ও অ্যাডভেঞ্চার অঙ্গনেও নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করবে।