দেশে ৪ কোটির বেশি মানুষ ভুগছে জয়েন্টের ব্যথায়

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৮ এএম

আব্দুল কাদের। বয়স ৫৫। হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারেন না। বেশ কিছুদিন এই সমস্যায় ভুগছেন তিনি। ঢাকার জুরাইন এলাকার যে বাসায় থাকেন সেখানে লিফটও নেই। ৫ তলায় উঠতে হয় অন্যের সহযোগিতা নিয়ে। এই বাসায় থাকা ষাটোর্ধ্ব হালিমা আক্তারেরও কোমরে ব্যথা। তিনি কোমর সোজা করে ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। ৪৫ বছর বয়সী ডেমরার বাসিন্দা হামিদও জয়েন্টের ব্যথায় ভুগছেন বলে জানান। শুধু এই তিনজনই নন; গবেষণা বলছে, দেশে চার কোটির বেশি মানুষ শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টের ব্যথায় ভুগছে। বিশ্বে এই সংখ্যা ১৭১ কোটির মতো। এর মধ্যে আর্থ্রাইটিসের রোগী কত তা নিশ্চিত নয়, তবে দেশে এই সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ।

এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস। প্রতি বছর ১২ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘Achieve Your Dreams’ বা স্বপ্নপূরণের আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য বাত ও পেশি-অস্থিসন্ধির রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রয়োজন, স্বপ্ন এবং সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে আনা।

বয়স বাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন, জয়েন্টে আঘাত ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তায় বাড়ছে বাত রোগের ঝুঁকি। দেশের একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে রোগ শনাক্তকরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা নিশ্চিত করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা ও কর্মক্ষমতা হারানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে বাত ও অস্থিসন্ধির রোগ। বয়স বাড়ার সঙ্গে এসব রোগের ঝুঁকি বাড়লেও এগুলোকে শুধু বার্ধক্যজনিত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত ওজন, জয়েন্টে পুরনো আঘাত, বংশগত প্রবণতা এবং কিছু প্রদাহজনিত রোগও এর পেছনে ভূমিকা রাখে। ফলে কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন বয়সের মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, ২০১৯ সালে বিশ্বে প্রায় ১৭১ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি ও সংশ্লিষ্ট কাঠামোর সমস্যায় ভুগছিলেন। তাদের রয়েছে কোমর ও ঘাড়ের ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন সমস্যা। এসব রোগ বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ।

এদিকে, ২০২১ সালের বৈশ্বিক রোগের বোঝা (গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ জিবিডি) নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ওই বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি ৬৫ লাখ মানুষ অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন। একই সময়ে নতুন আক্রান্তের আনুমানিক সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬৬ লাখ।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগের। দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৩০ দশমিক ৪ শতাংশের কোনো না কোনো পেশি-হাড়-অস্থিসন্ধিসংক্রান্ত সমস্যা আছে। এর মধ্যে কোমরের নিচের অংশের ব্যথা ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশের, হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস ৭ দশমিক ৩ শতাংশের এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ১ দশমিক ৬ শতাংশের। হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস প্রায় ১৪ জনে ১ জন এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস প্রায় ৬৩ জনে ১ জন। তাতে এই দুই ধরনের আর্থ্রাইটিসে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ আক্রান্ত।

এই গবেষণায় আরও দেখা যায়, পেশি-হাড়-অস্থিসন্ধিসংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ২৪ দশমিক ৮ শতাংশের কোনো না কোনো মাত্রায় দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে গেছে। এ গোষ্ঠীর ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ আগের ১২ মাসে কাজ হারানোর অভিজ্ঞতার কথা জানান। অর্থাৎ, এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মজীবন এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও সৃষ্টি করে। একজন শ্রমিক, কৃষক, পরিবহনকর্মী কিংবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করা ব্যক্তির হাঁটু বা কোমরের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তার কাজ করার সক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণাটি ২০২০ সালে বিএমসি রিউমোটালজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ওই হিসাবে দেশে প্রায় ৪ কোটির বেশি মানুষ জয়েন্টের ব্যথার সমস্যায় ভোগেন। এখন পরিস্থিতি কী তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) অধ্যাপক ড. মো. আবুল কেনান বলেন, দেশে আর্থ্রাইটিসের রোগীর সংখ্যা অনেক। তবে সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। বিশেষ করে হাঁটুসহ বেশ কিছু বড় জয়েন্টে আর্থ্রাইটিস রোগ হয়। ছোট জয়েন্টেও হয়; হাতে-পায়ে। এটা বিভিন্ন কারণে হয়। বয়সজনিত কারণে এবং এক ধরনের জেনেটিক কারণে হয়, যেটাকে অটোইমিউন বলা হয়। এছাড়াও ইনফেক্টিভ কারণে হতে পারে। মূলত বাংলাদেশে আর্থ্রাইটিস হয় দুটি কারণে। একটি বয়সজনিত, আরেকটি জেনেটিক বাতজনিত কারণে। বিভিন্ন জয়েন্ট ফুলে যায়, ব্যথা হয়, বয়স হলে জয়েন্ট ক্ষয় হয়ে যায়, কম বয়সে যখন হয় সেটি সাধারণত হাতের আঙুল, পা ও পায়ের আঙুল, গিরায় গিরায় ব্যথা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি পুরোপুরি কমে না। কম-বেশি সব সময় চিকিৎসার মধ্যে থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস আছে। যেমন- রিউমো আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস। আবার ইনফেকশনের কারণেও হতে পারে।

আর্থ্রাইটিস পুরোপুরি ভালো হয় না, এটি নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় উল্লেখ করে অধ্যাপক আবুল কেনান বলেন, মূলত বয়সকালে ক্ষয়জনিত কারণে যেটি হয়, হাঁটু বা অন্যান্য বড় জয়েন্টে, ওজন যাদের বেশি থাকে তাদের হয়, এটা পুরোপুরি সুস্থ হয় না। এদের নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস যেটাকে বলা হয় এটার ক্ষেত্রেও জেনেটিক বা অটোইমিউন ডিজিজ বলা হয়, এটাও পুরোপুরি সুস্থ হয় না। বিভিন্ন ওষুধ এবং নিয়মের মধ্যে রেখে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। একেবারে অ্যাডভান্স যেগুলো হয়, সেক্ষেত্রে হাত-আঙুল বাঁকা হয়ে যায়। বয়সজনিত কারণে যদি অস্টিওআর্থ্রাইটিস যেটাকে বলা হয়, হাঁটু বা জয়েন্ট ব্যবহার করা বা বাঁকানো কঠিন হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে হাঁটু প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন হতে পারে। আঙুলের ক্ষেত্রে যেটা হয়, যদি বেশি বাঁকা হয়ে যায়, কাজ করতে না পারে, সেক্ষেত্রেও অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। সমস্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করে আর্থ্রাইটিসকে নিয়ন্ত্রণে রেখে চলাফেরা করা যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘আর্থ্রাইটিস’ বলতে অস্থিসন্ধির প্রদাহজনিত বিভিন্ন রোগকে বোঝানো হয়। তবে সাধারণভাবে বাতের ব্যথা বলতে মানুষ অস্থিসন্ধির ব্যথা, ফোলা, শক্ত হয়ে যাওয়া ও চলাচলে অসুবিধাসহ নানা সমস্যাকে বুঝিয়ে থাকেন। সব ধরনের ব্যথাই আর্থ্রাইটিস নয়; আবার সব আর্থ্রাইটিসের কারণ ও চিকিৎসাও এক নয়। অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অস্টিওআর্থ্রাইটিসে অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ও আশপাশের অন্যান্য কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে। হাঁটু, নিতম্ব, মেরুদন্ড ও হাতের অস্থিসন্ধি এতে বেশি আক্রান্ত হয়। হাঁটাচলা, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সময় ব্যথা বাড়তে পারে। বিশ্রামের পর জয়েন্ট শক্ত লাগাও এর একটি সাধারণ লক্ষণ।

অন্যদিকে, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত অটোইমিউন রোগ। এতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের অস্থিসন্ধির আবরণকে আক্রমণ করে। হাত ও পায়ের ছোট ছোট জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘক্ষণ শক্ত হয়ে থাকার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলে জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত মানুষের প্রায় ৭৩ শতাংশের বয়স ৫৫ বছরের বেশি এবং প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। হাঁটু সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। তবে বয়স বাড়লেই যে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হবেই, তা নয়। জয়েন্টে আঘাত, অতিরিক্ত ওজন, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং কিছু বিপাকীয় সমস্যাও এর ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে ব্যথাকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিণতি ভেবে অবহেলা করা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া, সকালে দীর্ঘক্ষণ জয়েন্ট শক্ত থাকা, একাধিক জয়েন্টে ব্যথা, কিংবা ব্যথার কারণে হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চিকিৎসকরা রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, আঘাত থেকে সুরক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কথা বলেছেন। বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় নিজে থেকে ব্যথানাশক বা স্টেরয়েড গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শুধু ব্যথা সাময়িকভাবে কমে যাওয়াকে রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ হিসেবেও দেখা যাবে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত